গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বনখেকো, ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী মুচি জসিম ইকবালের গুলিবিদ্ধ লাশ গত শুক্রবার রাতে গভীর বনের ভেতরে থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। গতকাল শনিবার দিনব্যাপী উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে তার সন্ত্রাসীর সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিয়েছে প্রশাসন। এর মধ্য দিয়ে ওই মুচি জসিমের সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য শেষ হলো। এতে প্রায় ৯০০ শতাংশ বনের জমি উদ্ধার করা হয়। নিহত মুচি জসিমের নামে ১৬টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।
এদিকে নিহত জসিমের মরদেহ দাফনের জন্য গত শুক্রবার সন্ধ্যায় কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ জোড়াপাম্প এলাকায় নিয়ে আসা হয়। এ খবর পেয়ে এলাকাবাসী সেখানে উপস্থিত হন এবং লাশ কালিয়াকৈরে দাফনে বাধা দেন। পরে লাশ তার নিজ গ্রাম কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার হোসেনপুরে নিয়ে দাফন করা হয়।
এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সন্ত্রাসী মুচি জসিম ১৫-২০ বছর আগে জীবিকার খোঁজে কালিয়াকৈরে আসে। পরে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকার একটি জুতার কারখানায় কাজ নেন এবং ওই এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তার প্রথম স্ত্রীর পাঁচ মেয়ে আর দ্বিতীয় স্ত্রীর এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। এর আগে টোকাইয়ের কাজও করতেন তিনি। কখনো ছিলেন রাজমিস্ত্রির জোগালি। পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই জুতা বানিয়ে ওই কোম্পানিতে সরবরাহ করতে শুরু করেন। এ কারণে এলাকায় তিনি ’মুচি জসিম’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। একপর্যায় পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতে গিয়ে জসিমের উত্থান।
কালিয়াকৈর রেঞ্জের চন্দ্রা বিটের আওতায় ওই চন্দ্রার জোড়াপাম্প এলাকায় গজারি গাছ কেটে ধীরে ধীরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ শতাংশের বেশি বনের জমি দখল করে। এরপর তিনি রেকর্ডে জমি দাবি করে বিভিন্ন লোকের কাছে ৪-৫ লাখ টাকা করে প্রতি শতাংশ জমি বিক্রি করে। এভাবে বেশিরভাগই জবর-দখল করে নতুনপাড়া নামে একটি গ্রাম গড়ে তোলেন। অথচ বছর তিন-চার আগেও ওই এলাকাটি ছিল শাল-গজারির গভীর অরণ্যে ঘেরা। রাতারাতি পুরো বনাঞ্চল বিরানভূমিতে পরিণত করে গড়ে তোলা হয় নতুনপাড়া। প্রায় ২০০ পরিবারের কাছে বনের জমি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হন তিনি। এমনকি পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্যের মূল সোর্স ছিলেন জসিম। একপর্যায় তিনি গাজীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার হারুন-অর রশিদের সঙ্গে সংখ্যতা গড়ে তোলেন। এভাবে তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠেন।
ডিবি পুলিশ দিয়ে নিরাপরাধ ও নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায় করা ছিল জসিমের কাজ। তার ছোবল থেকে বাদ পড়েনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। বনের জমি দখল করে নিজের মায়ের নামে চারতলা একটি ভবনসহ একাধিক বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি। বানিয়েছেন একটি মসজিদও। সেই ভূমিতে তার মাকে কবরও দেয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি বন বিভাগের জমিতে ওই মসজিদ নির্মাণ নিয়ে সংঘর্ষ হয়। বাধা দেয়ায় চন্দ্রা বন অফিসের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায় জসিমের লোকজন। কালিয়াকৈর চন্দ্রা এলাকায় হাজারো মানুষের কাছে ভয়ঙ্কর আতঙ্কের নাম ছিল জসিম।
কে এই মুচি জসিম?
১৫ থেকে ২০ বছর আগে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা এলাকায় এসে জুতা তৈরির একটি কারখানায় পিয়ন পদে চাকরি নেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর গ্রামের মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে জসিম ইকবাল।
এর আগে কিছুদিন টোকাইয়ের কাজও করেন সে। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই জুতা বানিয়ে ওই কোম্পানিতে সরবরাহ করতে শুরু করেন জসিম। এজন্য এলাকায় মুচি জসিম নামে তার পরিচিতি রয়েছে।
তিনি সরকারি বন বিভাগের ৩০০ বিঘা জায়গা দখল করে বন কেটে গড়ে তুলেছেন নতুন এক গ্রাম চান্দরা নতুন পাড়া। আর এতেই সেই জসিম ইকবাল আজ শতকোটি টাকার মালিক। এ দখল বজায় রাখতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিনি ছিলেন এক মূর্তিমান আতংক।
জানা গেছে, একটি হত্যা মামলায় পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতে গিয়ে গোটা জীবনটাই বদলে নিয়েছেন জসিম। তার কাছে যেন কেউই নিরাপদ নয়। স্বার্থের পরিপন্থী হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর হামলে পড়তেন তিনি। একে একে ১৭টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি হওয়া সত্তেও প্রকাশ্যেই তিনি ঘুরে বেড়াতেন।
তার কুকর্মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য নিরীহ মানুষ। বাদ যাননি সরকারি কর্মকর্তাও।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের আশীর্বাদপুষ্ট জসিম ইকবালের রয়েছে শক্তিশালী ক্যাডার বাহিনী। কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় বনের অন্তত ৩০০ বিঘা জমি দখল করে পৃথক বেশ কয়েকটি সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন তিনি।
২০১৫ সালের ২১ আগস্ট চন্দ্রায় জাতির পিতা কলেজ মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কালিয়াকৈর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলামকে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। আর এই হত্যার ঘটনায় কপাল খুলে যায় মুচি জসিমের।
রফিকুল হত্যার আসামিদের ধরিয়ে দিতে থানা পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। অল্প সময়ের ব্যবধানে পুলিশের বিশ্বস্ততা অর্জনের সুযোগে হত্যা মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে এলাকার মানুষজনকে জিম্মি করে ফেলেন জসিম। তার সহযোগিতায় কালিয়াকৈর থানার পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানে না এমন মানুষজনকেও ধরে নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে আর জসিম মধ্যস্থতা করে তাদের ছাড়িয়ে আনতেন। থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে তিনি প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০-১৫ লাখ করে টাকা আদায় করতেন। কারও কারও কাছ থেকে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকাও নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।