এলাকার আলোচিত এক যুবকের নাম আমিরুল ইসলাম। এক সময় ছিলেন মুদি দোকানি। কিন্তু হঠাৎ করে বনে গেছেন ডাক্তার।
অভিযোগ উঠেছে, তিনি এনালাইজার ও ল্যাপটপে রোগ সনাক্ত করার নামে মানুষকে বোকা বানাচ্ছেন। আর মারাত্মক রোগের কথা বলে চিকিৎসা সেবা বাবদ হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা বাবু বাজারে একটি টোঙ ঘরের মধ্যে চিকিৎসার নামে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন আমিরুল ইসলাম। তিনি একাই করছেন সর্ব রোগের চিকিৎসা। আবার স্ক্যানিং ও ক্রসম্যাচিং ছাড়াই রোগীর শরীরে রক্ত সঞ্চালন করছেন।
আমিরুল ইসলাম বাগডাঙ্গা বাবু বাজার এলাকার আব্দুর রহমানের ছেলে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাগডাঙ্গা বাবু বাজারের মোফাজ্জেল মিয়ার মার্কেটে আমিরুল ইসলামের একটি পান ও মুদি দোকান ছিল। সেখানে আগে দোকানদারি করতেন তার পিতা আব্দুর রহমান। ৭-৮ বছর আগে আমিরুল মুদি দোকান ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। কয়েক বছর আগে ঢাকা থেকে ফিরে বাবু বাজারে আয়শা ফার্মেসি নামে একটি ওষুধ ঘর খুলে বসেন। এর ৫-৬ মাস পরেই তিনি নামের আগে ডাক্তার শব্দটি জুড়ে দেন।
ইদানিং তিনি এনালাইজার ও ল্যাপটপে মানুষের রোগ সনাক্ত করছেন বলে প্রচার করে রোগী টানার চেষ্টা করছেন। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমিরুল চিকিৎসা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে মানুষের সাথে প্রতারণা করছেন। তার এখানে আসা অধিকাংশ রোগী হচ্ছে বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের মহিলা।
রোগীদের সূত্রে জানা গেছে, আমিরুল ইসলামের রোগী প্রতি ফিস হচ্ছে ৩০০ টাকা। এছাড়া ওষুধপত্র সেখান থেকেই কিনতে হয়। তার প্রতিষ্ঠানে হোমিও, হারবাল, আয়ুর্বেদিক, এলোপেথিকসহ সব ধরণের ওষুধ পাওয়া যায়।
গত সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, তার চিকিৎসা কেন্দ্রে আসা এক নারী রোগীকে বসিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে শরীরে রক্ত সঞ্চালন করা হচ্ছে। আর রক্তের ব্যাগ রাখা হয়েছে ভুয়া ডাক্তারের পাশে ড্রয়ারের উপরে। অথচ মানবদেহে রক্ত সঞ্চালনের আগে স্ক্যানিং ও ক্রসম্যাচিং করার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। এছাড়া রোগী আসলেই ল্যাপটপের সামনে বসিয়ে এনালাইজারের সাথে কানেকশন থাকা একটি বস্তু হাতের মুঠোয় ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এরপর ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থেকে আমিরুল ইসলাম মানুষের রোগ সনাক্ত করছেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন।
কিন্তু, রক্তের দুই একটি পরীক্ষা ছাড়া এ মেশিনে কোন রোগ সনাক্ত সম্ভব নয়। এভাবে তিনি হৃদরোগ, ডায়াবেটিক, কিডনি রোগ ও হাড়ের রোগসহ সব রোগের চিকিৎসা করছেন।
বাবু নামে এক ব্যক্তি জানান, তার স্ত্রী মনোয়ারাকে চিকিৎসা ও ওষুধ বাবদ দুই দফায় হাতিয়ে নিয়েছেন ৫ হাজার টাকা। অথচ কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং আমিরুলের চিকিৎসার পর তার স্ত্রী আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
দুজন রোগীর স্বামী বাবলু ও ইদ্রিস আলী বিশ্বাস বিডি২৪লাইভকে জানান, ওই ডাক্তারের কাছে আসলেই প্রতিবার ফিস ও ওষুধ কেনা বাবদ ২ হাজার থেকে ২৫শ\’ টাকা বিল হয়। ল্যাপটপের সামনে বসে তিনি মারাত্মক রোগের নাম বলে মানুষকে আতঙ্কগ্রস্থ করে তোলেন।
এ বিষয়ে জানতে কথা হয় ডাক্তার পরিচয়দানকারী আমিরুল ইসলামের সাথে। তিনি বিডি২৪লাইভের যশোর প্রতিবেদককে জানান, তিনি পি.এল.এম.এফ নামে একটি শর্টকোর্স করেছেন। এজন্য নামের আগে ডাক্তার লিখেছেন। এনালাইজার মেশিন ও ল্যাপটপে রোগের ধারণা নিয়ে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেন। যদি সমস্যা হয় বন্ধ করে দেবো। স্ক্যানিং ও ক্রসম্যাচিং ছাড়াই রোগীকে বসিয়ে শরীরে রক্ত সঞ্চালন করছেন কেন প্রশ্ন করা হলে তিনি একবাক্যে বলেন কই না তো। ওই রোগীর শরীরে তো স্যালাইন দেয়া হচ্ছিল। যোগ করেন তিনি।
এ ব্যাপারে যশোর সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার রায় জানান, বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) কর্তৃক স্বীকৃত ডিগ্রি ছাড়া কেউ নামের আগে ডাক্তার লিখতে পারবেন না। যারা পি.এল.এম.এ.এফ ও আর.এম.পিসহ বিভিন্ন শর্টকোর্স করেছেন তারা ভিজিটিং কার্ড ও পরিচয় পত্রে নামের আগে পল্লী চিকিৎসক লিখতে পারবেন। কিন্তু নামের আগে সরাসরি ডাক্তার লেখা আইনানুগ অপরাধ।
সিভিল সার্জন আরও বলেন, এনালাইজার ও ল্যাপটপে রোগ সনাক্ত করা যায় না। এগুলো হচ্ছে সম্পূর্ণ ভাওতাবাজি ও প্রতারণা। এসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন হতে হবে। ডাক্তার পরিচয়দানকারী আমিরুল ইসলামের প্রতারণা ও অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান সিভিল সার্জন।