নদীতীরে গাছপালাঘেরা বাগানবাড়ি। তার পাশেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। নদীর তীর দখল করে গড়া প্রভাবশালীর এ স্থাপনা রক্ষা পায়নি উচ্ছেদ অভিযানে। বাধা না দিলেও মালিকপক্ষ বিষয়টি নিয়ে বাহাস করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) বুলডোজার দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে ঢাকা উদ্যানসংলগ্ন তুরাগ নদ তীরের ৫৫টি স্থাপনা। যার মধ্যে রয়েছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা হাজি মনিরের বাগানবাড়ি ও সাবেক কাউন্সিলর সাঈদ বেপারীর গার্মেন্ট। গতকাল সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এ অভিযান চলে।
উচ্ছেদ অভিযান শুরুর আগেই সকালে ভিড় দেখা যায় তুরাগতীরে। বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ ও শিশু ঢাকা উদ্যান প্রধান সড়কের পাশে অবস্থান নিয়েছিল। তাদের আলোচনায় ছিল আজ কার স্থাপনা ভাঙবে, কোনটি রক্ষা পাবে। সকাল ৯টায় নৌপথে দুটি বুলডোজার নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয় বিআইডাব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। প্রভাবশালীদের তদবিরে কান না দিয়ে তারা আগে চিহ্নিত করে রাখা সব অবৈধ স্থাপনাই ভেঙে ফেলে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত পঞ্চম দফায় দ্বিতীয় পর্যায়ের অভিযান ছিল গতকাল। এর আগে উচ্ছেদ অভিযানের প্রথম পর্যায়ে মোট ১২ কার্যদিবসে এক হাজার ৭২১টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তখন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ভাঙা পড়ে। দ্বিতীয় পর্যায়েও মোট ১২ কার্যদিবস উচ্ছেদ অভিযান চলবে। সব মিলিয়ে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগতীরের ৩০ কিলোমিটার এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
গতকাল উচ্ছেদ অভিযানের শুরুতেই ভাঙা পড়ে আওয়ামী লীগ নেতা হাজি মনিরুজ্জামান মনিরের বাগানবাড়ির একাংশ। তাঁর চারতলা ভবনটি উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় আসবে তা ছিল না অনেকের ভাবনায়। হাজি মনির আদাবর থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। সবিহা রিয়েল এস্টেটের মালিক মনির বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ঢাকা উদ্যান এলাকায় তাঁর অনেক জায়গাজমি রয়েছে বলে জানায় এলাকাবাসী।
বাগানবাড়িটি নদীর সীমানায় নয় বলে দাবি করেন হাজি মনিরের মা সাদিয়া বেগম। তিনি বলেন, ’বাড়িটি কেন ভাঙা হলো বুঝতে পারছি না। এটি তো অবৈধ ছিল না। আর অভিযান চালানোর আগে নোটিশ দেয়নি। আশপাশে অন্যদের ভবন লাল কালি দিয়ে চিহ্ন দেওয়া হলেও এটিতে তা ছিল না।’ শত্রুতা করে বাড়িটি ভাঙা হয়েছে দাবি করে বয়োবৃদ্ধ সাদিয়া বলেন, ’আমাদের অনেক সম্পত্তি আছে। নদী দখলের দরকার নেই। ঘাটের লোকজন শত্রুতা করে এ বাড়িটি উচ্ছেদের মধ্যে ফেলেছে।’ তিনি নোটিশ না পাওয়ার দাবি করলেও বাড়িটি থেকে আগেই মূল্যবান মালপত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ’নদীর সীমানার মধ্যে যা পড়েছে সেসব স্থাপনা ভাঙা হচ্ছে। আমাদের টিম এর আগে সার্ভে করে দেখেছে। অনেক দখলদার সীমানা পিলার সরিয়ে ফেলেছিল। প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত করে প্রথমে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সময় দিয়ে মালামাল সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। এর পরই উচ্ছেদ অভিযান। এ ক্ষেত্রে কারো অন্যায় আবদার শোনার সুযোগ নেই।’
দুপুরের দিকে নদীতীরে একটি বাড়ির ঘরসহ প্রাচীর ভাঙার কাজ করতে দেখা যায় বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষকে। তাদের সবার হাতে হাতুড়ি। জমির মালিক মোহাম্মদ হানিফ জানান, তাঁদের ছয় কাঠা জমির ওপর দুটি ভবন রয়েছে। একটির অংশ উচ্ছেদের মধ্যে পড়েছে। ২০১৬ সালে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। নোটিশ পেয়ে নিজেরাই চেষ্টা করছেন অবৈধ অংশটুকু ভেঙে ফেলতে। তবে অভিযান পরিচালনায় যুক্তরা বললেন, ’এসব লোক-দেখানো। মানবিক আবেদন তৈরির চেষ্টা। নোটিশ পেয়েও তারা আগে স্থাপনা সরায়নি।’
অভিযানের শেষ অংশে সাবেক কাউন্সিলর সাঈদ বেপারীর চারতলা গার্মেন্ট কারখানা ডিলাক্স এপারেলসের একাংশ ভাঙা পড়ে। সেখানে অনেক লোক উপস্থিত থাকলেও কেউ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেনি।
সূত্র: কালের কন্ঠ