বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরের সামনে গায়ে শার্ট, চোখে চশমা, জিন্স প্যান্ট, এই আধুনিক পোশাকে স্কুটির ওপর চেপে ছুটত ডালিয়া রহমান। কারাগারে ব’ন্দি হওয়ার আগে খালেদা জিয়া যতবার আদালতের পথে গুলশানের বাসা থেকে রওনা দিয়েছেন ততবার তার গাড়ির সামনে মোটরসাইকেল প্রটোকল হিসেবে দেখা যেত তাকে। খালেদার বহরের সামনে থাকতে যেতে বেশ কয়েকবার পুলিশের বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে। তবুও হাল ছেড়ে দেননি তিনি। কুমিল্লার সেই সাহসি তরুণী হলেন ডালিয়া রহমান। তখন থেকেই তিনি আলোচনায়। রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা ডালিয়া ২০০৬ সালে নিজ জেলা কুমিল্লায় ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ডালিয়া জানান, তাঁর বাবা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও সেখানে পড়াশোনা না করে ঢাকায় বেসরকারি ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। বর্তমানে নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে এলএলএম করছেন তিনি।
তৃণমূল পর্যায়ের প্রত্যক্ষ ভোটে বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল এবার শীর্ষ নেতৃত্ব বেছে নেবে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতে সংগঠনটির মাঠের কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ছে না। তবে আসন্ন কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাঙাভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রার্থীরা ছুটে বেড়াচ্ছেন জেলা থেকে জেলায়। সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থী ডালিয়া রহমানও ছুটছেন। এই পদে একমাত্র নারী প্রার্থী তিনি। ডালিয়া অবশ্য নিজেকে নারী প্রার্থী হিসেবে নয়, বরং একজন পরীক্ষিত কর্মী হিসেবে দেখছেন। ডালিয়ার সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন তিনি রাজশাহী বিভাগের এক জেলায় প্রচার শেষে ছুটছেন আরেক জেলায়। কাউন্সিলের আগে সব জেলায় প্রচার চালানোর উদ্দেশ্যে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। নারী প্রার্থী হিসেবে সংগঠনের শীর্ষ পদের একটিতে লড়ছেন—কথাটি বলতেই ডালিয়ার উত্তর, ’নিজেকে নারী প্রার্থী নয়, শুধু একজন প্রার্থী হিসেবেই ভাবছি। জিয়াউর রহমান বলতেন, প্রশিক্ষিত কর্মী হচ্ছে রাজনৈতিক দলের প্রাণ। আমি একজন পরীক্ষিত, প্রশিক্ষিত কর্মী। রাজপথ থেকে, তৃণমূল থেকে উঠে আসা কর্মী হিসেবেই নিজেকে দেখছি।

দীর্ঘদিন পর ছাত্রদল নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্বে পেতে যাচ্ছে। গত রোববার ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিল উপলক্ষে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি চূড়ান্ত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে সভাপতি পদে লড়ছেন আটজন। সাধারণ সম্পাদক পদে ১৯ জন। ছাত্রদলের সাবেক সহ-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়বিষয়ক সম্পাদক ডালিয়া রহমান এবার একমাত্র নারী প্রার্থী, যিনি সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ছেন। প্রার্থী হওয়া নিয়ে ডালিয়া বলেন, আমি সুযোগ পেয়েছি। নিজেকে নেতৃত্বের পর্যায়ে যোগ্য মনে করেছি। তাই প্রার্থী হয়েছি। তথাকথিত রাজনীতি আমি করিনি। নিজেকে গুটিয়ে রাখা, নেতৃত্বে কম আসা, একটু কম সাহস দেখানোর একটা প্রবণতা আছে। ছাত্রসংগঠনগুলোয় মেয়েদের কিছুটা অলংকার হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। সেই জায়গা থেকে বের হয়ে আমি সত্যিকারের নেতৃত্বের জায়গায় আসতে চাই। ছাত্রদলের শীর্ষ পদে একজন মেয়ে প্রতিযোগিতা করতে পারেন—সেই বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিতে চান ডালিয়া। তিনি চান, আরও মেয়ে এগিয়ে আসুক। তৃণমূলের কর্মীদের সমর্থন পাচ্ছেন বলে জানান তিনি। ডালিয়া বলেন, প্রচারে অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সবার সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছেন। স্থানীয় পর্যায়ে ছাত্রসংগঠন ছাড়াও অন্যান্য সংগঠনের সমর্থন পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

বাবার কথা স্মরণ ডালিয়া বলেন, বাবা তাঁকে বলতেন, রাজনীতি করতে চাইলে বিরোধী দল করে আসতে হবে। বিরোধী দল হচ্ছে রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। নির্বাচনে জিততে পারলে নিজের দায়িত্ব কী হবে, সে সম্পর্কে ছাত্রদলের এই সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী বলেন, ’কাউন্সিলের পর ছাত্রদলের প্রথম কাজ হবে ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) মুক্তির আন্দোলন ত্বরান্বিত করা। সংগঠনকে আরও গতিশীল করা। রাজপথে বড় ভূমিকা রাখতে চাই। এখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠন, বিশেষ করে ছাত্রদলের কর্মকাণ্ড শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় তেমন একটা চোখে পড়ে না। এ প্রসঙ্গে ডালিয়া বলেন, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হতে পারলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সহাবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করব। আমরা চাইব, সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন বিরোধী ছাত্রসংগঠনের ব্যাপারে সহনশীল হবে।

ডালিয়া সম্পর্কে ছাত্রদলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ’স্বচ্ছতার ভিত্তিতে এই কাউন্সিল করতে চাইছি। এবার প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিতদের মাধ্যমে কাউন্সিল করতে যাচ্ছি। জেলা পর্যায়ের কাউন্সিলরা ভোট দিয়ে যাঁকে নির্বাচন করবেন, তিনিই নেতৃত্বে আসবেন। এখনে ছেলেদের সংখ্যাই বেশি। একজন মেয়ে আছেন। আসলে কখনো কোনো মেয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হননি। সময়ের পরিবর্তনে নারী নেতৃত্ব এখন উঠে আসছে। ডালিয়া যদি ভোটে নির্বাচিত হন, অবশ্যই তা ভালো হবে। শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন আছে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন থেকে বলা আছে, ৩০ শতাংশ নারী রাজনৈতিক দলে থাকতে হবে। সেখানে সাহস করে কেউ বড় পদে এগিয়ে এলে তাঁকে দল অবশ্যই স্বাগত জানাবে। নির্বাচনের মাধ্যমে যাঁরা নেতৃত্বে আসবেন, দল তাঁদের শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করবে।

ছাত্রদলের একমাত্র নির্বাচিত সাবেক সভাপতি ও বিএনপির বর্তমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, তাঁদের সময়েও ছাত্ররাজনীতিতে মেয়েরা এগিয়ে ছিলেন। তবে কেন্দ্র পর্যায়ে কম ছিল, হলভিত্তিক বেশি ছিল। রুহুল কবির রিজভী আরো বলেন, ছাত্রদলের প্রধান দুই পদের একটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডালিয়া। এটা ভালো। এভাবেই মেয়েরা এগিয়ে আসবে, নেতৃত্ব দেবে। ছাত্রদলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে ১৪ সেপ্টেম্বর। প্রসঙ্গত, সাধারণ সম্পাদক পদে যদি ডালিয়া রহমান আসেন তবে সেটা ইতিহাস। কারণ এর আগে এই পদে কোনো নারী ছিলেন না। ডালিয়া রহমান সাধারণ সম্পাদক হবেন কি না তা ঠিক হবে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বরের ভোটে।