স্কুলের গণ্ডি পেরুতে না পারা সম্রাট ছাত্র রাজনীতি না করলেও ১৯৯৩ সালে হঠাৎ করেই যুবলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ওয়ার্ড যুবলীগের কর্মী হিসেবেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। বাবা লিফটম্যান হলেও রাজনীতির করে বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। ২০১২ সালে ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি পাওয়ার পর মতিঝিল ক্লাবপাড়ার ’ক্যাসিনো সম্রাট’ হয়ে ওঠেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরুর পর গা ঢাকা দেয়া সম্রাট হয়ে ওঠেন টক অফ দ্য টাউন। জুয়ার জগতে ক্যাসিনো সম্রাট নামেই পরিচিত তিনি। স্কুলের গণ্ডি পেরুতে পারেননি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। ছাত্র রাজনীতিও করা হয়নি। বাবা ছিলেন রাজউকের লিফটম্যান। অভাব অনটনের সংসার থেকে ১৯৯৩ সালে ঢাকা ওয়ার্ড যুবলীগের রাজনীতি শুরু করেন



সম্রাটের সম্পদ বলতে কিছুই নেই’- এমন বক্তব্য যুবলীগ দক্ষিণের বহিস্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন চৌধুরীর। যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেও গতকাল সোমবার জানা গেল, সম্রাটের দৃশ্যমান বড় ধরনের কোনো ব্যবসাপাতি নেই। কোনো শিল্পকারখানা রয়েছে এমন তথ্যও কেউ দিতে পারেননি। তাহলে প্রশ্ন হলো, সম্রাট দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে তার নামের আদলে সম্রাটসুলভ জীবনযাপন করে আসছিলেন? কথায় কথায় কীভাবে দেশে-বিদেশে কোটি কোটি টাকা খরচ করতেন তিনি? জন্মদিনের উপহার হিসেবে বিদেশি বান্ধবীকে বিলাসবহুল গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন কীভাবে? এর উত্তরে জানা গেল- ’নজরানা’, ’গুরুদক্ষিণা’, ’সেলামি’, ’উপঢৌকন’ ছিল সম্রাটের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। সম্রাটের নামের সঙ্গে ’বেমানান’ হওয়ায় তার সাঙ্গোপাঙ্গ অনেকে এসবকে ’চাঁদাবাজি’ বলতে ইতস্তত করছিলেন। তবে সবাই একবাক্যে বলছিলেন, ’গুরুদক্ষিণা’র অর্থ একা ভোগ করতেন না তিনি। ’প্রজাদের’ মধ্যেও বিতরণ করতেন।

এই প্রজার তালিকায় ছিলেন পুলিশ, সংবাদকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। দলীয় কর্মীরা তার দরবার থেকে কখনোই বিমুখ হননি। দেশে-বিদেশে থাকা একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীও ’নজরানা’র নিয়মিত ভাগ পেতেন। তাই সম্রাটকে নিয়ে অনেকে বলে থাকেন, ’ডান হাতে কামাতেন আর বাঁ হাতে খরচ করতেন তিনি।’ রোববার সম্রাট গ্রেফতারের পর অতি পতিভক্তি না দেখালেও তার স্ত্রী শারমিন অকপটে বলেছেন, ’আয়ের টাকায় স্বামী দল পালে, আর যা থাকে তা দিয়ে সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলে।’

রাজনীতিতে সম্রাটের উত্থান ও জীবনযাপন নিয়ে রয়েছে নানা চমকপ্রদ কাহিনী। জীবনকে ’উপভোগ’ করেছেন তিনি। যা চেয়েছেন, মুহূর্তে তা হাতের নাগালে চলে এসেছে। অথচ বাবা ফয়েজ আহমদের চাকরির সূত্র ধরে একসময় কাকরাইলে ছোট্ট খুপরি ঘরে বসবাস করতেন তারা। তার বাবা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। কাকরাইলের পর সম্রাটরা থাকতেন মালিবাগে। পরে সম্রাট বাসা ভাড়া নেন বাড্ডায়। কথিত আছে, একসময় কাকরাইলে রাজমণি সিনেমা হলকেন্দ্রিক কালোবাজারে সিনেমার টিকিট বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। কাকরাইলে সিনেমাপাড়ায় চলতে চলতে তৎকালীন মহানগর ছাত্রলীগ নেতা শহিদুল্লার সঙ্গে পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তিনি ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ওই কমিটির সভাপতি লুৎফর রহমানকে মারধরের অভিযোগে তাকে সংগঠন থেকেও বহিস্কার করা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের দিকে তার হার্টের সমস্যা ধরা পড়ে। তখনও অনেকের কাছ থেকে ধারদেনা করে চিকিৎসার খরচ চালান তিনি। ওই সময় কুয়েতফেরত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয় তৎকালীন সরকার। পরে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের ডেকে ডেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতে সহায়তা করেন সম্রাট। সেই প্রথম তার হাতে আসতে থাকে কিছু ’কাঁচা টাকা’। তা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের শেয়ারের একটি ছোট্ট অংশ কেনেন সম্রাট।

২০০১ সালে সাংসদ নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ও আওয়ামী লীগের অন্য একজন প্রভাবশালী নেতার আশীর্বাদে যুবলীগের আহ্বায়ক হন সম্রাট। ২০০৩ সালের সম্মেলনে মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছিলেন। পরে ২০১২ সালে দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হন তিনি। এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। মতিঝিল, ফকিরাপুল, আরামবাগসহ ঢাকার একটি বড় অংশে একক আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন সম্রাট। মতিঝিল ক্লাবপাড়া পুরো নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। ধারণা করা হয়, এসব নিয়ন্ত্রণ আর বিরোধের জের ধরে যুবলীগ নেতা মিল্ক্কীকে হত্যা করা হয়েছিল।

চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কাউন্সিলর মমিনুল হক সাইদ, আরমান, স্বপন, সরোয়ার হোসেন মনা, মিজানুর রহমান বকুল, মোরছালিন, মাকসুদুর রহমানকে ব্যবহার করতেন সম্রাট। গণপূর্তের জি কে শামীমের ঠিকাদারি কাজ পেতে ভূমিকা রাখতেন সম্রাট। মৎস্য ভবনে সম্রাটের আস্থাভাজন হিসেবে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করতেন বাবু ওরফে ক্যারেনসি বাবু। সব জায়গায় ঝামেলা পাকানোর কারণে বাবু ক্যারেনসি বাবু হিসেবে পরিচিত। সম্রাটের হয়ে আরও কয়েকটি দপ্তরে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করতেন বকুল ও ইমদাদ। কথিত আছে, যুবলীগের একজন সহসভাপতি সম্রাটের হয়ে স্বর্ণ পাচারে সম্পৃক্ত। ’গ্লাসবয়’ হিসেবে পরিচিত জাকিরের কাছে সম্রাটের কোটি কোটি টাকা রয়েছে। এ ছাড়া ফুলবাড়িয়া এলাকায় দুই ছাত্রলীগ নেতা আশপাশের বেশ কিছু মার্কেট ও অন্যান্য জায়গা থেকে চাঁদা তুলে সম্রাটের কাছে পৌঁছে দিতেন। মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের নেতা রবিউল ইসলাম সোহেলও সম্রাটের ক্যাসিনো পার্টনার। একজন সাবেক এমপির এপিএস সম্রাটের সঙ্গে ক্যাসিনো আসরে নিয়মিত যেতেন।

যুবলীগের একাধিক নেতার ভাষ্য, সংগঠনের কর্মসূচিতে হাজারো নেতাকর্মী হাজির করা যেমন একজন দক্ষ সংগঠকের কাজ, তেমনি ব্যক্তিজীবনে আদর্শবান হওয়া জরুরি। কারণ, নেতার আদর্শই তার শত শত কর্মী অনুকরণ করেন। তাই যে কোনো ভালো সংগঠকের পরিশীলিত চারিত্রিক গুণাবলির অধিকারী হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ ক্ষেত্রে সম্রাট অনেক পিছিয়ে ছিলেন বলে মনে করেন যুবলীগের অনেক নেতাকর্মী।

কাকরাইলে ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টার নামে ভবন ছিল সম্রাটের প্রধান আস্তানা। প্রথমে সেখানে তার একটি কক্ষ থাকলেও পরে পুরো ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি। সেখানে বসেই তিনি চালাতেন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড। পুরো ভবনে ছিল একাধিক বিশ্রামাগার। সম্রাট ছাড়াও সেখানে যুবলীগের আরও একাধিক নেতার ব্যক্তিগত অফিস ছিল। অফিস ছিল সাংসদ নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের। খাস কামরা বা বিশেষ কক্ষে বসে সম্রাট তার সাম্রাজ্য চালাতেন। সম্রাটের দরবারে গিয়ে অনেকে নজরানা দিয়ে আসতেন। আবার অনেকে নিয়মিত তার কাছ থেকে নজরানা নিতেন।

ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারের নেপথ্য কাহিনী: সম্রাটের আস্তানা কাকরাইলের ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারের জমির মালিক ছিলেন ওয়াজেদ আলী। পরে তার জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে মদিনা রিয়েল এস্টেট। এতে ৬৫ ভাগ পাওয়ার কথা ছিল রিয়েল এস্টেটের ও ৩৫ ভাগ জমির মালিকের। জমির মালিক ওয়াজেদ আলী তার মালিকানা বিক্রি করেন জনৈক ভূঁইয়ার কাছে। একসময় পুরো জমির মালিক ও রিয়েল এস্টেটকে বাদ দিয়ে পুরো ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেন সম্রাট। মদিনা রিয়েল এস্টেটের পরিচালক আবু সাঈদ রুবেল সমকালকে বলেন, তার দাদার নামে ওই ভবনের নাম রাখা হয়েছিল লতিফ ট্রেড সেন্টার। পরে সেই নাম বদলে দেওয়া হয়। ২০১০ সালে ভবনটি নির্মাণের পর পঞ্চমতলা নায়ক ও ব্যবসায়ী অনন্ত জলিলের কাছে ভাড়া দেন তারা। নিচের ফ্লোরটি অন্য একটি বিদেশি কোম্পানির কাছে ভাড়া দিয়েছিলেন। পরে পুরো ভবনটি দখল করে নেয় সম্রাট ও তার লোকজন। এরপর ১০ বছর এক টাকাও ভাড়া পাননি তারা। লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে তাদের।

প্রসঙ্গত, বিপুল অর্থ আর রাজধানীতে ৭ থেকে ৮টি বাড়ির মালিক তিনি। সম্রাটের দুই স্ত্রী। দুই ছেলে থাকে কানাডায়। সিঙ্গাপুরেও বিলাসী জীবন যাপন করেন সম্রাট। মাদক চোরাচালানসহ ঢাকার বিভিন্ন থানায় সম্রাটের নামে চাঁদাবাজি ও হত্যার একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেফতার হবার পর থেকে তারা নামে বেড়িয়ে আসছে আরো সব ভয়ঙ্গর তথ্য।