বাংলাদেশ একটি ছোট ঘনবসতি পূর্ন দেশ।নানা সমস্যায় জর্জরিত এই দেশটি। এর মধ্যে খাদ্যের সংকট, চিকিৎসার সমস্যা আরো নানা সমস্যায় জর্জরিত এই দেশটি।এর মধ্যে সব থেকে বড় যে দৈনান্দিন সমস্যাটি হলো সড়ক দুর্ঘটনা। প্রতিদিন সারা দেশে এই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় অনেকেই। একটি দুর্ঘটনার কারনে শেষ হয়ে যায় অনেক পরিবারের স্বপ্ন আরো ভালোবাসার মানুষগুলো।বাবা অনিল বর্মনের কাছে তেমনই সবথেকে কাছের আর ভালোবাসার মানুষ ছিলো তার মেয়ে অথৈ। গত সোমবার রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার বলি হয়ে মারা যায় তার বেচে থাকার একমাত্র আশা তার মেয়েটি। শোকে কাতর হয়ে বাবা বলেন,’আমার অথৈ ছিল আমার পৃথিবী। আমার দুঃখগুলো সে ভাগাভাগি করে নিত। কিন্তু আমার দুঃখগুলো ভাগ করে নেয়ার মতো এ পৃথিবীতে কেউ রইল না।’
অথৈর বাবা অনিল বর্মণ আরো বলেন, ’আর কোনো বাবা যেন আমার মতো কষ্ট ভোগ না করেন। আমার মেয়েকে তো আর ফিরে পাব না। তবে মেয়ের হত্যাকারী বাসচালকের ফাঁসি চাই।’ মঙ্গলবার তিনি যুগান্তরকে এসব কথা বলেন।

অথৈদের বাড়ির কেয়ারটেকার রাজু মিয়া বলেন, সব সময় বাড়ির সবাইকে বিভিন্ন ছলে অথৈ প্রাণবন্ত করে রাখতেন। বছর খানেক আগে তারা এ বাড়িতে এলেও অল্প দিনেই তিনি সবাইকে আপন করে নেন।

রাজধানীর মহানগর মহিলা কলেজের মার্কেটিং বিভাগের বিবিএ তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী অথৈর স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে পরিবারের হাল ধরার। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন সোমবার রাতের সড়ক দুর্ঘটনায় চুরমার হয়ে গেছে। বাসচাপায় তার মৃত্যু হয়েছে। একমাত্র মেয়েকে ঘিরে মা-বাবার আশা-আকাক্সক্ষারও ইতি ঘটেছে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে অথৈ ছিলেন বড়। শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের জন্য কিশোরগঞ্জের দামপাড়া গ্রামে অথৈর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, শৈশব থেকেই অর্থৈ সবক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। থিয়েটার, নাচ, গানের প্রতি অনুরক্ত অর্থৈ স্কুল-কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সর্বাগ্রে থাকতেন।

কয়েকটি মঞ্চনাটকে অভিনয় ছাড়াও কবিতা আবৃত্তি ও ছবি আঁকা ছিল তার নেশা। এতসব কিছুর পরও পার্টটাইম চাকরি করে তিনি অসহায় বাবার অন্ধের যষ্টি হয়ে উঠেছিলেন। বড় হয়ে তিনি সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন। ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে বাবাকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের জন্য কিছু করার তার স্বপ্ন সব স্বপ্নই রয়ে গেল।

মঙ্গলবার সরেজমিন রাজধানীর গেণ্ডারিয়া সতীশ চন্দ্র রোডের ৫৪/বি-এ অথৈদের বাসায় গিয়ে সুনসান নীরবতা দেখা যায়। বাড়ির সবাই শোকে নিথর। মেয়ের শোকে মা ঝর্ণা বর্মণ বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর বিলাপ করে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠেন আর বলেন, ’আমার সোনাকে আমার কাছে এনে দাও।’

লক্ষ্মীবাজারের মহানগর মহিলা কলেজে গিয়ে দেখা যায়, কলেজ ভবনের সামনে অথৈর মৃত্যুতে শোকবার্তা সংবলিত ব্যানার। সহপাঠী ও শিক্ষকরা তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। মার্কেটিং বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ফারুক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, মেয়েটি সব সময় পড়ালেখার প্রতি মনোযোগী ছিল। কলেজের নবীনবরণ ও বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে তার পারফর্ম ছিল চোখে পড়ার মতো। তার এমন মৃত্যুতে কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা শোকাহত বলে তিনি জানান।

কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনিরুল ইসলাম আকন্দ যুগান্তরকে বলেন, অথৈর মৃত্যুতে আমরা স্তব্ধ, শোকাহত। একটি তরতাজা নিষ্পাপ মেয়ে এভাবে অকালে ঝরে গেল। এমন মৃত্যু কারোই কাম্য নয়। আমরা তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে আহ্বান তারা যেন ঘাতক বাসটির চালককে আটক করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করেন।

উল্লেখ্য, সব সময় প্রানবন্ত একটি মেয়ে ছিলো অথৈ। বয়স একুশ পেরিয়েছে সবেমাত্র। লেখাপড়া করতেন মহানগর মহিলা কলেজের তৃতীয় বর্ষে। অভিনয়, আড্ডা আর লেখাপড়া এ নিয়েই কাটত সময়। বন্ধুদের হাসি-আনন্দে মাতিয়ে রাখতেন সবসময়। মঞ্চ নাটকে নিয়মিত উপস্থিতি ছিল তার। ছোট পর্দায়ও কয়েকবার অভিনয় করার সুযোগ হয়েছিল। স্বপ্ন ছিল একদিন বড় অভিনেত্রী হবেন। কিন্তু বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার জুজু কেড়ে নিলো তার প্রান আর তার সব স্ব্প্ন মিলিয়ে গেলো তার সাথেই।