ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন নগরে বস্তিবাসীদের বৈধ কোনও জমি না থাকায় বস্তিতে ফুটপাত, ড্রেন, স্যানিটারি ল্যাট্রিন, বাথরুম, নলকূপ ইত্যাদি নির্মাণ বা স্থাপন করা সম্ভব নয়। এজন্য মহানগরীতে বসবাসকারী বস্তিবাসী প্রতিটি পরিবারের জন্য দুই রুমের আবাসন সুবিধা (ফ্ল্যাট) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তাদের জন্য ’জাতীয় নগর দারিদ্র্য হ্রাসকরণ কর্মসূচি’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২৬ কোটি ১২ লাখ টাকা। মোট বরাদ্দের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে ১২৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য পাওয়া যাবে ৬৯৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প সহায়তা বাবদ প্রত্যাশিত ৬৯৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ডিএফআইডি ও  ইউএনডিপি’র কাছ থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া যাবে। দেশের আটটি বিভাগে অবস্থিত ৩৬টি জেলার পৌরসভা ও চারটি সিটি করপোরেশন এলাকায় স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা রয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সমাজে সুষম ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার বিভাগ শহর এলাকায়  দারিদ্র্য নিরসনের জন্য ইউকেএইড (ডিএফআইডি) জিইএস ও ইউএনডিপি’র অনুদানে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নগরের দরিদ্র বসতিগুলোতে পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা দিতে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলো। ফলে নগরগুলোতে বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার পৌরসভাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে এই প্রকল্পটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য,গত বছরের ২৫ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রথম এ প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়েছিল। এতে বলা হয়, ’নগরীর বস্তিবাসীদের লিগ্যাল কোনও জমি না থাকায় বস্তিতে ফুটপাত, ড্রেন, স্যানিটারি ল্যাট্রিন, বাথরুম, নলকূপ ইত্যাদি নির্মাণ বা স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ যুক্তিযুক্ত নয়। ফলে আলোচ্য প্রকল্পটির উদ্দেশ্য পরিবর্তন করে স্বল্প আয়ের লোকদের জন্য এক রুম বা দেড় রুমের ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী প্রকল্পটি পুনর্গঠন করা হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, একনেক সভার উক্ত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বস্তিতে ফুটপাত, ড্রেন, স্যানিটারি ল্যাট্রিন, বাথরুম, নলকূপ ইত্যাদির সংস্থান ডিপিপি হতে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে হতদরিদ্র পরিবারের জন্য বাসস্থান নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণের সংস্থান রেখে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার পরিবারের জন্য পৌরসভা প্রদত্ত জমিতে প্রতিটি পরিবারের জন্য দুই রুমের ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। ফ্ল্যাটগুলো শুধুমাত্র হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হবে। নিম্ন আয়ের ১৫ হাজার পরিবারকে নিয়ে কমিউনিটি হাউজিং ডেভেলপমেন্ট ফান্ড গঠন করে বিনাসুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহায়ণ ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে।
পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন জমিতে পানির সংযোগ, স্যানিট্শেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অ্যাপ্রোচ রোডসহ প্রভৃতি অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। বিষয়গুলো ডিপিপিতে সংস্থান রেখে স্থানীয় সরকার বিভাগ ৮২৬ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ডিপিপি পুনর্গঠন করে এবং  ২০১৮ সালের ১৬ এপ্রিল পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়।
জানা গেছে, প্রস্তাবিত পুনর্গঠিত ডিপিপির ওপর এ বছরের ২১ মে পিইসি’র (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভার সুপারিশ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিভাগ পুনর্গঠিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেয়।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্র জানায়, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য পরিবেশবান্ধব বাসস্থান নির্মাণ ও মৌলিক সেবা দেওয়া, কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ করা, কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতার উন্নয়ন করা, স্থিতিশীল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জলবায়ু সহিষ্ণু দক্ষতা বাড়ানো, উন্নত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা ও নীতিমালা ও পরিকল্পনার জন্য পৌরসভাকে শক্তিশালী করতেই এ প্রকল্পটি নিয়েছে সরকার। 
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের আওতায় পাঁচ হাজার হতদরিদ্র পরিবারকে সরাসরি দুই রুম বিশিষ্ট আবাসন সুবিধা দেওয়া হবে। ১৫ হাজার হতদরিদ্র পরিবারকে কমিউনিটি হাউজিং ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের আওতায় গৃহঋণ দেওয়ার মাধ্যমে আবাসন সুবিধা দেওয়া হবে। সরাসরি ৫ হাজারটি ও সিএইচডিএফ-এর মাধ্যমে ১৫ হাজার ফ্ল্যাটের বেসিক সেবা যেমন—পানি সংযোগ, স্যানিটেশন, ড্রেনেজ, অ্যাপ্রোচ রোড, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা দেওয়া হবে। এই প্রকল্পের আওতায় আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের পুষ্টি সহায়তা, ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষা সহায়তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক অনুদানও দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব জাফর আহমেদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ’জাতীয় নগর দারিদ্র্য হ্রাসকরণ কর্মসূচি’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এ প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে নগরীতে বসবাসরত বস্তিবাসীদের জীবনমান উন্নত হবে। তারা নিজস্ব আবাসন সুবিধা পাবে। এতে তাদের মানবেতর জীবন-যাপনের অবসান ঘটবে।’ banglatribune