বদলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার গণপরিহন ব্যবস্থা। দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর হচ্ছে সরকার। আগামী ২০ আগস্টের মধ্যে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আসছে আমূল পরিবর্তন।
জানা গেছে, স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠা-নামা বন্ধ করাসহ নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে পরিবহনের ফিটনেস ও লাইসেন্স, পরিবহন ব্যবস্থাপনা, সড়ক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্বল্প সময়ে বাস্তবায়নের জন্য ১৭টি নির্দেশনা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
বৃহস্পতিবার (১৬ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন বিষয়ক এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে নজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত কার্যবিবরণীতে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
নির্দেশগুলো হলো-
১. চলন্ত অবস্থায় সব গণপরিবহনের দরজা বন্ধ রাখতে হবে, নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া যাত্রী উঠানামা করা যাবে না।
২. গণপরিবহনের দৃশ্যমান দুটি স্থানে চালক ও হেলপারের ছবিসহ নাম এবং চালকের লাইসেন্স নম্বর ও মোবাইল নম্বর প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ দুটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ডিএমপি ও বিআরটিএ দায়িত্ব পালন করবে।
৩. সব মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীকে (সর্বোচ্চ দুইজন আরোহী) বাধ্যতামূলক হেলমেট এবং সিগন্যাল আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে ডিএমপি।
৪. সব মহাসড়কে বিশেষত: মহাসড়কে চলমান সব পরিবহনে (বিশেষত: দূরপাল্লার বাস) চালক এবং যাত্রীর সিটবেল্ট ব্যবহার এবং পরিবহনসমূহকে সিট বেল্ট সংযোজনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিআরটিএ এবং বাংলাদেশ পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ চারটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে ২০ আগস্টের মধ্যে।
সড়ক ব্যবস্থাপনায় ৯টি সিদ্ধান্ত এবং পরিবহনের ফিটনেস এবং লাইসেন্সের জন্য চারটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সর্বাত্মক প্রচার ও গণমাধ্যমে প্রচারণা, সভা আয়োজনের পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়।
সড়ক ব্যবস্থাপনায় ৯ সিদ্ধান্ত:
১. ১৮ আগস্টের মধ্যে রাজধানীর যেসব স্থানে ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাস রয়েছে সেসব স্থানের উভয় পাশের ১০০ মিটারের মধ্যে রাস্তা পারাপার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি যারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাস ব্যবহার করবে তাদের ’ধন্যবাদ’ কিংবা ’প্রশংসাসূচক’ সম্বোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাসে প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২০ আগস্টের মধ্যে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা এবং ৩০ আগস্টের মধ্যে বাইরে আয়নার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. ১৮ আগস্টের মধ্যে শহরের সব সড়কে জেব্রা ক্রসিং ও রোড সাইন দৃশ্যমান করে ফুটপাত দখলমুক্ত ও অবৈধ পার্কিং এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। সড়কের নাম ফলক দৃশ্যমান স্থানে সংযোজন করতে হবে।
৪. ট্রাফিক সপ্তাহে চলমান কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে। দুই সিটি কর্পোরেশন ও ডিএমপিকে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক বাস্তবায়িত ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা কর্তৃত্ব পুলিশকে হস্তান্তর করতে হবে। এ জন্য আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিএনসিসি ও ডিএমপিকে সময় দেয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনিষ্পন্ন বাংলাদেশ পুলিশ থেকে পাওয়া ’জনবল’ বিষয়ক প্রস্তাবের সব সিদ্ধান্ত সমন্বয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) ফোকাল পয়েন্টে কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ এবং উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে।
৬. শহরে রিমোট কন্ট্রোল অটোমেটিক বৈদ্যুতিক সিগন্যালিং পদ্ধতি চালু করা। ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে ডিএমপি।
৭. দুই সিটি কর্পোরেশনকে রোড ডিভাইডারের উচ্চতা বৃদ্ধি বা স্থানের ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৮. মহাখালী ফ্লাইওভারের পর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ন্যূনতম দুটি স্থানে স্থায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি দৈবচয়নের ভিত্তিতে যানবাহনের ফিটনেস এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা নেয়া হবে। শহরের অন্যান্য স্থানেও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী অস্থায়ী অনুরূপ কাজের জন্য মোবাইল কোর্ট বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসন, ডিএমপি ও বিআরটিএকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
৯. স্কুল সময়ে যেখানে সেখানে রাস্তা পারাপার বন্ধেও সভায় আলোচনা হয়েছে। এ জন্য শহরের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠান ছুটি বা শুরুর আগে অপেক্ষাকৃত বয়ঃজ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী, স্কাউট এবং বিএনসিসির সহযোগিতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।
ফিটনেস এবং লাইসেন্স সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ
১. অবৈধ পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, ফিটনেস সনদ প্রদান প্রক্রিয়াতে অবশ্যই পরিবহন দর্শনপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ,
২. রুট পারমিট বা ফিটনেসবিহীন যানবাহনগুলোকে দ্রুত ধ্বংস করার সম্ভাব্যতা যাচাই,
৩. লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ’লার্নার’ সনদ দেয়ার সময় ড্রাইভিং টেস্ট নেয়া যেতে পারে বলেও মতামত দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া উত্তীর্ণদের দ্রুত লাইসেন্স প্রদান,
৪. কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঘাটতি থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণে পদক্ষেপ নেবে বিআরটি।
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নে বিআরটিএ, বিআরটিসি, বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা প্রশাসক, বাংলাদেশ স্কাউট, আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন এবং শিক্ষা ও তথ্য মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
এছাড়া গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ সর্বাত্মক প্রচারে জনসাধারণকে অবহিতের জন্য গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা নিতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সভায় শনিবার সকাল ১০টা থেকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি), স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব, দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) ও মহাপরিচালক (জিআইইউ) এয়ারপোর্ট সড়ক হতে নগর ভবন পর্যন্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়ক পরিদর্শন করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
pbd