সেবা অধিদফতরের পরিচালকের কাছে ফোন আসে। তিনি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বলা হয়, মন্ত্রী মহোদয় কথা বলবেন, ধরুন। পরিচালক নড়েচড়ে বসেন। হ্যালো, আমি ...বলছি। নার্সদের প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারে আমার কিছু সুপারিশ আছে। ওকে করে পাঠিয়ে দিন। পরিচালক কোনো জবাব দেওয়ার আগেই ওপাশের ফোনের লাইন কেটে যায়।

পরিচালক হন্তদন্ত হয়ে নিজের টেবিলে রাখা আবেদনের ফাইল খুলে দেখেন। হ্যাঁ, মন্ত্রীর সুপারিশ আছে। বেশ অনেকগুলো। তিনি এগুলো আলাদা করেন। সেবা অধিদফতরে আবেদনপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখেন তারা। কিন্তু ১৭ জন স্টাফ নার্সের আবেদনে শুধু স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর নয়, আছে বাণিজ্যমন্ত্রী, রেলমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, একাধিক সংসদ সদস্যসহ কয়েকজন সচিবের সুপারিশ, সিল ও স্বাক্ষর। যা দেখে পরিচালকের সন্দেহ হয়। একই সময় বিভিন্ন অপরিচিত নম্বর থেকে পরিচালকের কাছে মন্ত্রীরা ফোন দিচ্ছেন। এতে পরিচালকের সন্দেহ বেড়ে যায়।
এরপর পরিচালক নিজে সচিবালয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, আসলে তাকে কোনো মন্ত্রী বা সচিব ফোন দিতেন না। ঘটনাটি ২০১৬ সালের ঘটনা। পরিচালক শেরেবাংলা নগর থানায় ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট একটি মামলা করেন। মামলা নম্বর ১৭। ওই বছরের ১২ আগস্ট মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।
সিআইডি এ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারে মূল হোতাদের কথা। মাত্র ৩০ হাজার টাকায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমসহ একাধিক মন্ত্রীর স্বাক্ষর জাল করে নার্সদের প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানোর কথা আদালতে স্বীকার করে প্রতারক চক্র। মন্ত্রী ছাড়া সচিবদের স্বাক্ষরও জাল করার কথা স্বীকার করেছে এই চক্রের দুই সদস্য।
সিআইডি জানায়, ২০১৬ সালে শেরেবাংলা নগর থানায় নার্সিং ও মিডওয়াইফারি (সেবা অধিদফতর) অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক নাসিমা পারভীনের করা একটি মামলার তদন্তের সূত্র ধরে এই চক্রের চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার চারজনের মধ্যে দুজন আদালতে মন্ত্রীদের স্বাক্ষর জাল করার কথা স্বীকার করে।
সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ’সরকারি ব্যবস্থাপনায় নার্সদের স্বল্পমেয়াদে স্পেশালাইজড কোর্সে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ২০১৬ সালে সরকার সার্কুলার দেয়। এরপর সারা দেশ থেকে উপযুক্ত নার্সরা আবেদন করেন। প্রতি বছর অন্তত ১০ জন করে নার্সকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য এভাবে পাঠানো হয়। মালয়েশিয়ায় এই প্রশিক্ষণ বেশি হয়ে থাকে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি দেশে নার্সদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। নার্সরা প্রশিক্ষণ শেষে এককালীন এক লাখ টাকা পেয়ে থাকেন। এ কারণে নার্সদের প্রশিক্ষণে যাওয়ার আগ্রহ থাকে। তাদের এই আগ্রহের সুযোগ নেয় প্রতারক চক্র। সেবা অধিদফতর ও বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে কর্মচারীদের মধ্যেই গড়ে উঠেছে এই প্রতারক চক্র।’
সিআইডির কর্মকর্তা বলেন, ’২০১৬ সালে সেবা অধিদফতরের অফিস সহকারী ছিলেন মো. আবদুল কুদ্দুস মিয়া। তার সঙ্গে পরিচয় হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (স্টুয়ার্ড) আনিসুজ্জামানের। এই আনিসুজ্জামান নিজেকে প্রভাবশালী বলে পরিচয় দেন আবদুল কুদ্দুস মিয়ার কাছে। তার সঙ্গে অনেক মন্ত্রী ও সচিবের সম্পর্ক আছে। বিদেশে নার্স পাঠানোর ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রাখতে পারেন। এরপর তারা দুজন মিলে নার্সদের কাছ থেকে আবেদন সংগ্রহ করেন। এ কাজে আরও কয়েকজন তাদের সহযোগিতা করেছেন। আবেদনপত্রের ওপর বিভিন্ন মন্ত্রীর জাল স্বাক্ষর ও সিল মেরে সেগুলো সেবা অধিদফতরে জমা দেওয়া হয়। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার জায়গায় সিসি ক্যামেরা থাকায় অফিস সহকারী নিজে আবেদনপত্র জমা দিতেন না। আনিসুজ্জামানকে দিয়ে ওই বছর (২০১৬) সব আবেদনপত্র জমা দেওয়া হয়।’
ওই কর্মকর্তা বলেন, ’ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টুয়ার্ড আনিসুজ্জামান বিভিন্ন অনিবন্ধিত ও চোরাই সিম থেকে বিভিন্ন মন্ত্রীর পরিচয়ে তৎকালীন পরিচালককে ফোন দিতেন। তাকে প্রথমে গ্রেফতার করা হয়। তিনি মূলত স্বাক্ষর জাল করতেন। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। আনিসুজ্জামান ছাড়াও সেবা অধিদফতরের অফিস সহকারী আবদুল কুদ্দুস মিয়া এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। তারা প্রার্থীদের কাছ থেকে ৩০ হাজার করে টাকা নিতেন। বিনিময়ে তারা এই জালিয়াতি করতেন।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ’আমরা ১৭ জন নার্সকে পেয়েছি, যারা জালিয়াতির মাধ্যমে প্রশিক্ষণের সুবিধা নিয়েছিলেন। আমরা তাদের চিহ্নিত করেছি। তারাও অপরাধী। কারণ তারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে মূল হোতাদের গ্রেফতারের জন্য আমরা এতদিন প্রার্থীদের গ্রেফতার করিনি। এখন মূল হোতাদের চারজনকে গ্রেফতার করেছি। তাদের মধ্যে আবদুল কুদ্দুস ও আনিসুজ্জামান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা জালিয়াতির কথা স্বীকার করেছেন।’
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এমন প্রতারক চক্র সারা দেশেই ছড়িয়ে রয়েছে। এরা কখনো এমপি বলছি, মন্ত্রী বলছি বলে ফোন করে সুপারিশ করে থাকে। যারা এদের সাহায্য নেয়, তারা চক্রের সদস্যদের মতোই অপরাধী। এসব পথে চাকরি নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।-সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন