সমকাল সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল হত্যাকাণ্ড মামলার প্রধান আসামি শাহজাদপুর পৌরসভার সাময়িক বহিষ্কৃত মেয়র হালিমুল হক মিরু উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় ও আতঙ্কে রয়েছেন শিমুলের স্ত্রী ও স্বজনরা। এই ঘটনায় শুধু তারাই নয়, হতাশ হয়েছেন শাহজাদপুরবাসীও। জামিনে বের হয়ে আসলে মিরু বাদীদের ভয়ভীতি দেখাতে পারেন, এ আশঙ্কায় তার জামিন দ্রুত বাতিলের জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের আহ্বান জানিয়েছেন স্বজনরা।
এদিকে দীর্ঘ ২১ মাস পর জামিন পেয়েছেন শাহজাদপুর পৌরসভার সাময়িক বহিষ্কৃত মেয়র হালিমুল হক মিরু। তার জামিন প্রশ্নে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে উচ্চ আদালতের বিচারপতি এম. এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রবিবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে তার জামিনের আদেশ দেন।
উচ্চ আদালতে মেয়র মিরুর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী এ. এম আমিনউদ্দিন মানিক ও আবদুল আলিম মিয়া জুয়েল। বাদী পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ইউসুফ মাহমুদ মোরেশেদ। জামিনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের বিরোধীতা থাকা সত্বেও মিরু জামিন লাভ করেন। উচ্চ আদালতের এ জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আজ আপিলে যেতে পারে রাষ্ট্রপক্ষ।
গত ১৮ অক্টোবর উচ্চ আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন আবেদন করেন মিরু। তখন আদালত তার জামিন প্রশ্নে রুল জারি করেন। বয়স, অসুখ ও ২০ মাসেও মামলার অভিযোগ গঠন না হওয়ার বিষয়ে রুলটি যথাযথ বিবেচনায় নিয়ে উচ্চ আদালত মিরুকে জামিন দিয়েছেন বলে জানা গেছে। জামিন প্রাপ্তির বিষয়টা নিশ্চিত করেন মিরুর স্থানীয় আইনজীবী অ্যাড. সানোয়ার হোসেন। মিরু বর্তমানে সিরাজগঞ্জের কারাগারে রয়েছেন।
মিরুর জামিন প্রাপ্তির বিষয়টি শুনেছি বলে মন্তব্য করে সিরাজগঞ্জ কারাগারের তত্বাবধায়ক মো. আল মামুন বলেন, ’জামিনের কাগজপত্র আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পৌঁছানোর পর তা সঠিকভাবে পরখ করার পর যথাযথ হলেই কেবলমাত্র মিরু মুক্ত হতে পারবেন।
এদিকে, মিরুর জামিনের খবর পেয়ে নতুন করে শাজাদপুরে জনমনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে সংশয়ে পড়েছেন সাংবাদিক শিমুলের স্ত্রীসহ স্বজনরা। শিমুলের স্ত্রী নুরুন্নারহার বেগম ও খালাতো ভাই আবুল কালামসহ শাহজাদপুরের মাদলা গ্রামের অনেকেই মিরুর জামিনের খবরে গভীর হতাশ হয়েছেন।
এদিকে, মামলাটি শুরু থেকেই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরে শিমুলের সহকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের বার বার দাবির প্রেক্ষিতে অনুমতির জন্য সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা গত ১০ মাস আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মামলার নথিপত্রসহ সুপারিশ পাঠান। কিন্তু এখনও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণারয়ের সেই কাঙ্ক্ষিত অনুমতি সিরাজগঞ্জ আসেনি। স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে, মিরু ও তার সহযোগীদের বাঁচাতে মামলাটি যেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে না যেতে পারে, সেজন্য বিশেষ গোষ্ঠির তদবিরে প্রভাবশালী একটি মহল শুরু থেকেই নানা ফন্দি-ফিঁকির করছেন। আর ওই মহল স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়েও বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে মামলার বিচারিক কার্যক্রমের গতি থমকে দিতেও পাঁয়তারা করছে বলে নিহত শিমুলের স্ত্রী ও স্বজনরা শুরু থেকেই এ ধরনের অভিযোগ করে আসছেন।
শাহজাদপুর পৌরসভার একটি ঠিকাদারী কাজ সম্পন্ন নিয়ে দ্বন্দ্বে মিরুর দু’সহোদর হাবিবুল হক মিন্টু ও হাসিবুল হক পিন্টুসহ তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী গত ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি শাহজাদপুর কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি বিজয় মাহমুদকে ধরে এনে পৌর এলাকায় মিরুর বাড়িতে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর করে হাত-পা ভেঙে দেয়। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের স্থানীয় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে মিরুর বাড়ি ঘেরাও করে।
এ সময় মিরুর সহোদরদের উভয় পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষ চলাকালে মিরু নিজেও শটগান হাতে নিয়ে সহোদর ও সন্ত্রাসী বাহিনীর সঙ্গে মহরা দেন। সেসময় গুলি ছুড়তে শুরু করেন মিরু। সংঘর্ষের সময় স্থানীয় লোকজনের দ্বারা ধারণকৃত ভিডিও চিত্র যা যা পরবর্তীতে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত হতেও দেখা যায়। এরই একপর্যায়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন ও ছবি সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক শিমুল মিরুর ছোড়া শটগানের গুলিতে গুরতর আহত হন। পরদিন ৩ ফেব্রুয়ারি বগুড়া শজিমেক হাসপাতাল থেকে ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান সাংবাদিক শিমুল।
এ ঘটনায় শিমুলের স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম বাদী হয়ে তার মেয়র হালিমুল হক মিরু, তার ভাই হাবিবুল হক মিন্টুসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা আরও ২০/২২ জনসহ সর্বমোট ৪০ জনকে আসামি করে শাহজাদপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ২ মে শাহজাদপুর আমলি আদালতে অভিযোগ জমা দেয় পুলিশ। পুলিশি অভিযোগ ও শিমুল স্ত্রীর এজাহার সূত্রে এসব জানা যায়।
মামলা দায়েরের দু’দিন পর ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার শ্যামলী এলাকা থেকে মামলার প্রধান আসামি হালিমুল হক মিরুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মিরু গ্রেফতারের পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় মিরুকে মেয়র পদ থেকে এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ তাকে দলের পদ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে। এর আগে উপজেলা আওয়ামীলীগ তার সদস্য পদ থেকে বহিস্কার করে। মিরু তখন জেলা আওয়ামীলীগেরও সাংগঠনিক সম্পাদক।
এদিকে, তদন্ত শেষে খুনের ঘটনার প্রায় ৩ মাস পর আদালতে ৩৮ জনের নামে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। মামলাটি প্রথমে শাহজাদপুর আমলি আদালত থেকে জেলা জজ আদালত এবং পরে অতিরিক্ত জেলা জজ-২য় আদালতে স্থানান্তর হয়। গত ২০ মাসেও এ মামলায় অভিযোগ গঠন হয়নি। আদালতে সব আসামি হাজির না হওয়ায় অভিযোগ গঠনের শুনানি বার বার পিছিয়ে যায়। জেলার অতিরিক্ত জেলা জজ-২য় আদালতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের শুনানীর দিন ধার্য আছে। বর্তমানে এ মামলার সব আসামি জামিনে মুক্ত আছেন।banglatribune