ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এখন রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেছেন। ২০০৭ সালে ’মাইনাস-টু’ মিশন বাস্তবায়নে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকায় থাকা এই সেনা কর্মকর্তা একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রাথী হচ্ছেন। ফেনী-৩ আসনে জেনারেল মাসুদ জাতীয় পার্টি থেকে মনোনীত হয়ে এখন মহাজোটের প্রার্থী হতে জোর লবিং চালাচ্ছেন। তরে ওয়ান-ইলেভেনে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে রুখতে স্থানীয়ভাবে জোড়ালো হয়ে উঠেছে গণমত। ফেনী-৩ আসনে গঠিত হচ্ছে জেনারেল মাসুদকে প্রতিরোধে নাগরিক কমিটি।
সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় রাজনৈতিকভাবে উচ্চাভিলাসী হয়ে ওঠা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে প্রতিরোধ করতে ফেনী-৩ আসনের একাধিকস্থানে সভাসমাবেশ হয়েছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে জেলার দাগনভূঞা ও সোনাগাজী উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও দু’টি পৌরসভার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকরী কমিটি গঠনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। এই আন্দোলনে সচেতন নাগরিক ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, পরিবার বা পরিবারের সদস্যরা যুক্ত হতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০০৭ সালে এক-এগারোর পটপরিবর্তনের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবার ফেনী-৩ আসনে নির্বাচন করতে প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। গত ১১ নভেম্বর (শনিবার) ধানমন্ডি কার্যালয় থেকে ফরম সংগ্রহ করার পর গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের উন্নয়নের রাজনীতিতে শরীক হতেই মনোনয়নপত্র নিলাম। প্রধানমন্ত্রী শেথ হাসিনার দেশগঠনের ইতিবাচক রাজনীতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে জনসেবা করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন দিলে এলাকার মানুষের জন্য কাজ করবো।
এ ঘটনার তিনদিন পরেই গত ১৪ নভেম্বর (বুধবার) রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসী এই সেনা কর্মকর্তা শিবির পাল্টে জাতীয় পার্টির মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। পরদিন ১৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জাপা প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং চেয়ারম্যানের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দলীয় গঠনতন্ত্রের ২০/১/ক ধারা অনুযায়ী এই নিয়োগ দেন। পাশাপাশি তিনি নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রাথী হিসেবে জেনারেল মাসুদের নামও ঘোষণা করেন। নিজের রাজনৈতিক পূনর্বাসন প্রক্রিয়াকে নিষ্কন্টক করে তুলতে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা মহাজোটের প্রাথী হতে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী পারিকারিকভাবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বেয়াই। তিনি বেগম জিয়ার ছোট ভাই সাঈদ এস্কান্দারের ভায়রা। বিএনপি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে বাড়তি সুবিধায় জ্যৈষ্ঠদের ডিঙিয়ে একাধিক পদোন্নতি আদায় করে নেন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন তিনি। ওই বছরই মেজর জেনারেল থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি।
সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এক-এগারোর পরিবর্তনের পর গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। দুদকসহ সরকারের আরও কয়েকটি দপ্তর হাতে পেয়ে তিনি অনির্বাচিত সরকারের সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ঢালাওভাবে তাদের হেনস্থা করে জেনারেল মাসুদ বিতর্কিত হন। দুই নেত্রীকে মামলার ফাঁদে কারাবন্দি করার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, বলে অভিযোগ ওঠেছিল।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ২০০৮ সালের ২ জুন ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে বদলি করা হয়। ৮ জুন তার চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত হন।লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর চাকরির বয়সসীমা শেষ হয় ২০১১ সালের ২৯ জুন। এরপর প্রথমে তিন মাস করে দুই দফায় তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরবর্তী সময়ে আরো দুই দফায় এক বছর তার চাকরির মেয়াদ বাড়ে। টানা ছয় বছর হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন শেষে অবসর নিয়ে দেশে ফেরেন ২০১৪ সালে । ওই সময়ই তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচনের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনের তার প্রথম পছন্দ ছিল আওয়ামী লীগই। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীজটে তার মনোনয়ন অনিশ্চিত টের পেয়ে শেষপর্যন্ত রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে জাতীয় পার্টিকে বেছে নিলেন জেনারেল মাসুদ।