পঞ্চগড়-১ আসনের প্রার্থীদের সাক্ষাতকারের মধ্যে দিয়ে রোববার থেকে শুরু হয়েছে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার। প্রথমদিন ছিল রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের প্রার্থীদের সাক্ষাতকারে লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়েছিলে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সকালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রথম সাক্ষাতকার দেন ওই আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ইউনুস আলী নামের এক নেতা।
সাক্ষাতকারের শুরুতেই বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা মনোনয়ন প্রত্যাশীদেরকে জানিয়ে দেন, বিগত ১২ বছর কে কী করেছেন, কোন নেতার কী অবদান- সে খবর দলের কাছে আছে।
এ সময় মনোনয়ন প্রার্থীদের কাছে প্রশ্ন করা হয়, এই ১২ বছর প্রার্থী সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি দলের দ্বারা কী ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন? তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের পাশে কীভাবে ছিলেন? এবং নিজে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন? ২০১৪ সালে কি ভূমিকা রেখেছেন? শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকতে পারবেন কিনা? প্রতিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে শক্ত হাতে অবস্থান নিতে পারবেন কিনা?
সাক্ষাতকার বোর্ডে দায়িত্ব পালন করছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়েছিলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত তারেক রহমান।
দলের মনোনয়ন পেতে সাক্ষাতকার দিয়েছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে সাক্ষাতকার বোর্ডে তারেক রহমানের উপস্থিতি সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তারেকের উপস্থিতিকে বিএনপি নেতারা অনুপ্রেরণা ও শক্তি হিসেবে দেখছেন৷
দিনাজপুর -১ কাহারোল আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী মামুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন, মনোনয়ন বোর্ডে ভিডিও কনফারেন্সে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপস্থিতি আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি ছিল। তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, কোন যোগ্যতা দেখে আপনাকে মনোনয়ন দেয়া হবে? মনোনয়ন পেলে কী করবেন? জয়ী হতে পারবেন কিনা? শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকতে পারবেন কিনা? দল থেকে যাকে নমিনেশন দেয়া হবে তার পক্ষে কাজ করবেন কিনা?
’’এসব প্রশ্নের জবাবে আমি বলেছি, আমি এখন উপজেলা চেয়ারম্যান। এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও আমি জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। আমাকে দল থেকে মনোনয়ন দিলে অবশ্যই আমি নির্বাচিত হবো এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন ধরে রাখবো।’’
জয়পুরহাট-১ আসন থেকে মনোনয়নের জন্য সাক্ষাতকার দিয়েছেন আবু সাইদ আহমেদ। লন্ডন থেকে তারেক রহমান সাক্ষাতকার গ্রহণকে দলের জন্য ত্যাগের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন তিনি৷
’’একজন ত্যাগী নেতার পরিচয় এটি। তার প্রতি দেশের মানুষের অনেক চাওয়া৷ কিন্তু তিনি নানা কারণে দেশে আসতে পারেন না৷ তারপরও এতো কষ্ট করেও মধ্য রাতে বসে আমাদের সাক্ষাতকার নিচ্ছেন। এটা অত্যন্ত সুন্দর দিক’’-বলছেন আবু সাইদ।
নীলফমারি-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসন থেকে মনোনয়নের জন্য সাক্ষাতকার দিয়েছেন কণ্ঠশিল্পী বেবি নাজনীন৷
তিনি বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভালো মন্তব্য করেছেন৷ তার কথায় অনুপ্রেরণা পেলাম। আমি বলেছি, আমি এলাকা মানুষের সঙ্গে কাজ করছি সবসময়৷ জন্মলগ্ন থেকে বিএনপির সঙ্গে আছি৷ এখন সংসদে থেকে জনগণের উন্নয়ন করতে চাই। প্রত্যাশা করি দল থেকে মনোনয়ন পাবো।
দিনাজপুর-২ আসনের বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী মনজরুল ইসলাম বলেন, এই আসন থেকে আমরা ৪ প্রার্থী আছি। আমি তৃণমূলের নেতা৷ এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক। আমি ২০১৪ সালে আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি৷ আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ কথা বলেছেন সাক্ষাতকারে৷ লন্ডন থেকে তার উপস্থিতি আমাদের মাঝে শক্তি যুগিয়েছে। আগামীতেও যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে তারেক রহমানের আস্থার প্রতিদান দিব।
নীলফমারি-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের মনোনয়নের জন্য সাক্ষাতকার দিয়েছেন বিএনপি নেত্রী বিলকিস ইসলাম।
তিনি বলেন, মনোনয়ন বোর্ডে ভিডিও কনফারেন্সে তারেক রহমানের উপস্থিতি আত্মবিশ্বাস পেয়েছি। আমরা শক্তি পাচ্ছি। আগামী নির্বাচনে যদি দল থেকে মনোনয়ন পাই তাহলে ইনশাআল্লাহ শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়ে ঘরে ফিরবো।
বিলকিস ইসলাম আরো বলেন, আমি মনে করি এবার নারীদের গুরুত্ব দেয়া হবে। আমি ৩০ বছর ধরে রাজনীতি করছি। ৮ম সংসদে সংরক্ষিত আসনে ছিলাম। এবার আমার বিশ্বাস আমি দলের মনোনয়ম পেলে বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের আস্থার প্রতিদান দিতে পারবো৷
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নিজেদের দলীয় নেতা তারেক রহমানের উপস্থিতিকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখলেও বিরোধী আওয়ামী লীগ শিবির এ বিষয়ে আইন লংঘন হয়েছে কিনা খতিয়ে দেখতে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং দেশের মানুষের কাছে বিচার চেয়েছেন৷
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন কিনা, তা খতিয়ে দেখতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি অনুরোধও জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ইসির প্রতি এ অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, এটা জাতির কাছে বলতে পারি যে একজন দণ্ডিত, পলাতক আসামি এ ধরনের বক্তব্য দিতে পারে কিনা? আমি জাতির কাছে এর বিচার চাইছি। আরেকটা হচ্ছে, ইলেকশন কমিশনের কাছে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যে, দু’টি মামলায় একটিতে সাত বছর এবং আরেকটিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত একজন বিদেশে আছেন, পলাতক- এভাবে ভিডিও কনফারেন্স করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে কিনা, এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এর পরপরই নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি দিয়ে বলেছেন, তারেকের ভিডিও কনফারেন্সের ব্যাপারে আইন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে৷ এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করলে বিদ্যমান আইন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)
এখানেই থেমে নেই। এরই মধ্যে একজন দণ্ডিত ও পলাতক ব্যক্তি হিসেবে তারেক রহমানের টেলিকনফারেন্সে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার গ্রহণ নির্বাচনী আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছে কর্নেল ফারক খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল৷
তারেক রহমানের ভিডিও কনফারেন্সে অংশগ্রহণ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে কারা সাক্ষাতকার গ্রহণ করবে সেটা বিএনপির নিজেদের ব্যাপার। সেটা নিয়ে কথা বলার এখতিয়ার কারো নেই।
সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার অনুষ্ঠানের বাইরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি দলের অংশ। আর আমাদের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে কে সাক্ষাতকার নেবেন এ নিয়ে কথা বলার কারো এখতিয়ার নেই।
নির্বাচনের জন্য এখনও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি বলেও মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।
সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত রংপুরের ৮ জেলার আসনগুলোর মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার নেয়া হয়৷ এরপর থেকে রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার আসনগুলোর মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার নেয়া হচ্ছে। দুই বিভাগের ১৬ জেলায় মোট আসন সংখ্যা ৭২টি।