বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রথম শ্রেণির এই পদে কন্যা চাকরিপ্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির সচিবের তত্ত্বাবধানে চলে নিয়োগের বিভিন্ন কার্যক্রম। নিয়োগ কমিটিতে থাকার জন্য কন্যার চাকরিপ্রার্থী হওয়ার কথা আগেভাগে জানাননি সচিব। নানা অজুহাতে যোগ্য প্রার্থীদের বাছাইয়ের নামে আগেই বাদ দেয়া হয়।
জানা গেছে, অনুগত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির অধীনে লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি এবং খাতা দেখার কাজ চলে। আর পরীক্ষা নেয়ার কাজে জড়িত ছিলেন খোদ সচিব। চাকরির শেষজীবনে এসে নিয়োগ পরীক্ষায় পাশ নিশ্চিত করতে নিজের কন্যার কক্ষে অনুগত ব্যক্তিকে পরিদর্শকের দায়িত্ব দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় কন্যাকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করানো হয়। উত্তীর্ণদের গতকাল সোমবার কম্পিউটার জ্ঞান পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। আজ মঙ্গলবার ভাইভা পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে প্রার্থীদের মধ্যে। ভুক্তভোগীদের পক্ষে একজন অনিয়মের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছেন। এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বেশির ভাগ সদস্য বিব্রত। এসব কারণে তারা লিখিত পরীক্ষার খাতা দেখতে অপারগা প্রকাশ করেন বলে ওই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউজিসির সচিব ড. মো. খালেদ অবশ্য দাবি করেছেন, নিয়োগ কমিটির সদস্য হলেও তিনি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো পর্যায়ে তিনি কোনো প্রভাব বিস্তার করেননি। অবশ্য পরীক্ষার হল ব্যবস্থাপনা এবং নিয়োগের দাফতরিক কাজ করার কথা স্বীকার করেন তিনি।
তিনি দাবি করেন, তার কন্যা যে আবেদনকারী তা তিনি আগেভাগে ইউজিসি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন।
তবে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ’আমি জানি না কন্যা আবেদনকারী এই কথাটি সচিব জানিয়েছিলেন কি না। তবে এটা ঠিক সাধারণ চর্চা হচ্ছে কন্যা দূরের কথা, কোনো আত্মীয়ও কোথাও প্রার্থী থাকলে পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজে সাধারণত কেউ জড়িত হন না। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই চর্চা করে এসেছি।’
অবশ্য চেয়ারম্যান দাবি করেন, নিয়োগের খাতা দেখাসহ গোপনীয় কোনো প্রক্রিয়ায় সচিব জড়িত ছিলেন না। কেবল পরীক্ষার হল ব্যবস্থাপনায় জড়িত ছিলেন।
জানা গেছে, ড. খালেদ নিয়োগের কাজে অংশ নেয়ার কথা না বললেও তিনি এ সংক্রান্ত কমিটির একজন সদস্য। এ ছাড়া কমিটিতে আহ্বায়ক হলেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. শাহ নওয়াজ আলী। সংস্থাটির পরিচালক সুলতান মাহমুদ ভুইয়া এবং সদস্য সচিব হলেন ইউজিসির প্রশাসন বিভাগের উপ-সচিব ফজলুর রহমান।
নিয়োগ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শাহ নওয়াজ আলি বলেন, ’কমিশনের সচিবের কন্যা আবেদন করেছে ও লিখিত পরীক্ষায় টিকেছে। সচিব হিসেবে নৈতিকভাবে তার সন্তানকে এখানে আবেদন করানো সঠিক হয়নি বলেই মনে করি। এটা আমাদের জন্য বিব্রতকর। আমাদের সততা ও স্বচ্ছতার বিষয়টি এতে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বাংলাদেশে বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার কন্যা যোগ্য হলে সব জায়গাতেই তার চাকুরি হবে।’
ইউজিসি সূত্রের তথ্য এবং দুদকে দায়ের করা অভিযোগ থেকে জানা গেছে, গত মে মাসে একসঙ্গে একাধিক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলেও কেবল সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া অযথা ৬ মাস আটকে রাখা হয়। এরপর কোনো কমিটি গঠন ছাড়াই কমিশন সচিবের একক প্রচেষ্টায় তারই তত্ত্বাবধানে গত ২১ ডিসেম্বর পরীক্ষা নেয়া হয়।
ইউজিসি সদস্যরা বাইরের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ পরীক্ষা নেয়ার প্রস্তাব করেন। কিন্তু সচিব চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করে সেই পরীক্ষা ইউজিসির অধীনে নেন। সদস্যদের দাবি অগ্রাহ্য করায় সদস্যরা পরীক্ষার খাতা দেখতে অপারাগতা প্রকাশ করেন। পরে চেয়ারম্যান ও সচিবের অনুগত এক সদস্য ওই নিয়োগ পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেন। অন্যসব পরীক্ষায় লিখিত সর্বনিম্ন পাশ থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা রাখা হয়নি। ফলে অন্যান্য পদে যেখানে অন্তত ১০-১২ শতাংশকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়, সেখানে এ ক্ষেত্রে ৬টি পদের বিপরীতে মাত্র ১৮ জনকে ডাকা হয়েছে। ফলপ্রকাশের ক্ষেত্রেও ধূর্ততার আশ্রয় নেয়া হয়। কন্যার বিষয়টি গোপন রাখতে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কেবল রোল প্রকাশ করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউজিসি একজন সদস্য জানান, সচিবের মেয়েকে নিয়োগ দিতেই সব আয়োজন করা হয়। আড়াই হাজার প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১২০৪ জনকে পরীক্ষার প্রবেশপত্র দেয়া হয়। ঠুনকো অভিযোগে বাকিদের বাদ দেয়া হয়। এর আগেও আরেকবার নিজের কন্যাকে নিয়োগের প্রচেষ্টা চালান সচিব। তখন পরীক্ষার হল ম্যানেজ করতে পারেননি। ফলে এবার লিখিত পরীক্ষা উৎরানোর ব্যবস্থা করা হয়।
তবে এ ব্যাপারে ড. খালেদ বলেন, পরীক্ষার হলে খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন যে, কেমন পরীক্ষা হয়েছে। আমি প্রভাব বিস্তার করিনি। প্রভাব বিস্তার করলে আগেরবারই আমার মেয়ের চাকরি হতো।
উল্লেখ্য, গত ২১ ডিসেম্বর শুক্রবার সকাল ১১টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এ নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন ওই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, দুটি কক্ষে ৮০জন করে প্রার্থীকে বসানো হয়েছে। সর্বমোট ২৩টি কক্ষে পরীক্ষা নেয়া হয়। নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে ইউজিসি সচিব ড. মোহাম্মদ খালেদ কক্ষ পরিদর্শন করছেন।jagonews24