মায়ের হাতের বরইয়ের (কুল) আচার ও বানানো নাড়ু আর খাওয়া হয়নি মিতুর। আচার আজও সযত্নে রাখা আছে ফ্রিজে। কিন্তু এই সব কিছু কেড়ে নিয়েছে আকাশ থেকে উড়োজাহাজ মাটিতে আছড়ে পড়ায়। আর একমাত্র কন্যাকে হারিয়ে বাবা-মা আজ বুকে চাপা কান্না নিয়ে বেঁচে আছেন।
গত বছরের ১২ মার্চ নেপালের কাঠমুন্ডু ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইট বিধ্বস্ত হলে মারা যান ৫১ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ছিলেন তিন দম্পতিসহ মিতু।

মা-বাবার সাথে বিলকিস আরা মিতুর শেষ কথা হয়েছিল ১১ মার্চ নিউইয়র্ক থেকে প্লেনে ওঠার আগে। বলেছিলেন, মা আমি বাংলাদেশে আসছি। তুমি বাবাকে নিয়ে বিমানবন্দরে এসো। আর সাথে করে বরইয়ের (কুল) আচার ও নাড়– বানিয়ে নিয়ে আসবে। বাবা তুমি কি থুড় থুড়ে বুড়ো মানুষ হয়ে গেছো যে তোমার লাঠি লাগবে।

আর শেষ দেখা হয়েছিল ২০১৭ সালের জুন মাসে। আর এর পরে বাবা-মা-ভাইসহ স্বজনদের সাথে মিতুর দেখা হয়েছে, তবে সেটা ছিল কফিনে সাদা কাপড়ে মেড়ানো অবস্থায়।

বাবা গোলাম কিবরিয়া বললেন, বিজিবির চাকরি করার সুবাদে বছরের অধিকাংশ সময় কাটত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ছুটিতে বাড়ি এলেও প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ছাড়া মেয়ের সাথে তেমন কথা হতো না। বিদেশে স্বামীর সাথে থাকাকালীন মাঝে মধ্যে কথা হতো। কিন্তু আজ এক বছর মেয়ের কণ্ঠে আর বাবা ডাক শুনতে পান না। গত বছর ঢাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউআইটিএসের সামবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য মিতু আসছিল। তবে তার আসার কথা ছিল ১৩ মার্চ সকাল সাড়ে ৭টায়। কিন্তু এক দিন আগে আর্থাৎ ১২ মার্চ ঢাকা চলে আসে সেটা জানা ছিল না।

কারণ নিউইয়র্ক থেকে আসার পথে তার এক দিন কুয়েতে থেকে ১৩ মার্চ ঢাকায় পৌঁছার কথা। সে জন্য ১২ তারিখ রাতে রাজশাহী থেকে ঢাকা রাতের ট্রেনের টিকিটও কাটা হয়েছিল।

বিজিবির অবসরপ্রাপ্ত নায়েক সুবেদার বলেন, সেদিন (১২ মার্চ) সন্ধ্যা থেকেই প্রস্ততি নেয়া শুরু করি ঢাকা যাবার জন্য। রাতে খাওয়া শেষ করে যখন ঢাকা যাবার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে তখন ঠিক রাত ১০টার দিকে ফোনে খবর এলো মিতু আর এই পৃথিবীতে নেই। নেপালে প্লেন দুর্ঘটনায় মারা গেছে। প্রথমে ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। তার তো আসার কথা ১৩ মার্চ, সে এক দিন আগেই চলে এসেছে ঢাকায়, জানায়নি কাউকে। আসলে মিতু কুয়েতে না থেকে সরাসরি চলে আসে ঢাকায়। ঢাকায় তার ভাইয়ের বাসায় না গিয়ে বিমানবন্দরে দেখা হওয়া বান্ধবীর সাথে নেপালে যাবার জন্য রওনা হয়েছিল। আর দেখা হলো না মেয়ের সাথে বলে চোখ মুছতে লাগলেন বাবা।



মিতুর মা মনোয়ারা বেগম বলেন, একমাত্র কন্যা নিউইয়র্ক থেকে প্লেনে ওঠার আগেও কথা হয়। এক সপ্তাহের জন্য সে এসেছিল। বরইয়ের আচার ও নাড়ু বানিয়ে বিমানবন্দরে যাবার জন্য বলেছিল। তখন হাতে মাত্র এক দিন সময়। এর মধ্যে আচার ও নাড়ু বানিয়ে নেয়। সেই আচার আজও ফ্রিজে রাখা আছে। মেয়ের এই শেষ ইচ্ছেটুকু পূরণ করতে না পাবার বেদনা আজও তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সেই আচার এখনো ফ্রিজে রাখা আছে।

তিনি বলেন, মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। সব ধরনের কথা শেয়ার করতেন মিতু। তবে মেয়ে তাকে প্রায় বলতেন দেশে নারীদের জন্য কিছু একটা করবেন। সেই লক্ষ্যে সে গার্মেন্টস করার চিন্তাভাবনা করছিল। নিজের চাকরির অর্থ ও তার বাবার কাছ থেকে কিছু অর্থ নিয়ে তা করতে চেয়েছিল বলে জানালেন তিনি।

গত বছরের ১২ মার্চ নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত হন বিলকিস আরা মিতু। বিমানবন্দরে অবতরণের সময় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৫১ জন নিহত হন। আহত হন আরও ২১ জন। এ বিমানে মিতু ছাড়াও রাজশাহীর আরও তিন দম্পতি ছিলেন।
http://www.poriborton.com/upload/March%202019/12/Nepal-plane-1.jpg
মিতুর স্বামী আজিজুল হক ফায়ারম্যানস অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য স্টেট অব নিউইয়র্কের একজন স্টাফ নার্স। তার দেশের বাড়ি চট্টগ্রামে। তবে আজিজুল মিতুর দ্বিতীয় স্বামী। ২০০৯ সালে মিতুর সঙ্গে রাজশাহী মহানগরীর উপশহর এলাকার তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে এমরান হোসেনের বিয়ে হয়েছিল।
এমরান রেলওয়েতে চাকরি করেন। তার সঙ্গে সংসার করা অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে আজিজুল হকের সঙ্গে পরিচয় হয় মিতুর।

পরে ২০১৩ সালের ২৯ আগস্ট তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। পরের বছর আজিজুলকে বিয়ে করে ২০১৫ সালে নিউইয়র্ক পাড়ি দিয়েছিলেন মিতু। তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউআইটিএস থেকে এমবিএ করেন। এরপর নিউইয়র্কে যান। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমার্তন অনুষ্ঠান ছিল ১৭ মার্চ। সেই সমাবর্তনে যোগ দিতেই তিনি নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় এসেছিলেন মিতু।

সূত্র:পরিবর্তন