বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিদিনই ছড়াচ্ছে ব্যপকহারে। দেশে এখন করোনার যা পরিস্থিতি তাতে দেশের বর্তমান অবস্থা এবং এর আগের অবস্থার মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান পরিলক্ষন করা যাচ্ছে। তবে এখানে সব থেকে বেশি গড়মিলের শিকার হচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া হিসাব নিয়ে। প্রতিনিয়তই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যর সাথে মিল পাওয়া যায় না বাস্তবের। দেখা গেছে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যে বিশেষ ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে, কেবলমাত্র সেই ওয়ার্ডেই গত চার দিনে ২৮ জনের মৃ;/ ত্যু হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।

আরো পড়ুন

Error: No articles to display

আর এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর একদিকে যেমন অনেকের মধ্যে বেশ উদ্বেগ-আতঙ্ক তৈরি করেছে, তেমনি কিছু প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

এর একটি বড় কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন যে বুলেটিন প্রকাশ করছে, তার সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের বেশ গরমিল পাওয়া যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানাচ্ছে যে গত ২রা মে থেকে ৫ই মে পর্যন্ত এই চার দিনে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের রোগ কোভিড ১৯ -এ মৃ’/ ত্যু হয়েছে ১৩ জনের।

অথচ এই চার দিনে কেবল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মৃ’/ ত্যু হয়েছে ২৮ জনের।

বাংলাদেশে সরকার যে কয়টি হাসপাতালকে বিশেষ কোভিড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করেছে, তাতে অন্যতম সংযোজন হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজের এই করোনা ইউনিট।

এসব হাসপাতাল এবং এর বাইরেও করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে অনেকের মৃ’/ ত্যু খবরও এখন পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদের উপর ভিত্তি করে সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গত ৮ই মার্চ থেকে ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে ৩৮৬ জনের মৃ’/ ত্যু হয়েছে।

বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী, গবেষক, ফ্রিল্যান্সার এবং কম্পিউটার ডেভেলপারদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল এই গবেষণা পরিচালনা করছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে প্রায় ২৫০ জনের মধ্যেই জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং সর্দি - এর চারটি লক্ষণের মধ্যে অন্তত দু’টি লক্ষণ ছিল।

এছাড়া অন্যদের মধ্যে গলা-ব্যথা, ঠাণ্ডা, বুকে ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ ছিল।

তবে স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া হিসেব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে গত ৮ই মার্চ থেকে ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত ১৬৮ জন মা’/রা গেছেন।

ফলে এমন প্রশ্নও উঠেছে যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনাভাইরাস সংক্রমণের যে চিত্র তুলে ধরছে, সেটির সঙ্গে বাস্তবতার আসলে ঠিক কতটা মিল রয়েছে।

জ্বর-কাশি মানেই করোনাভাইরাস না
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা বিবিসি বাংলাকে জানান, হাসপাতাল থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার ভিত্তিতেই তারা আক্রান্ত ও মৃ’/তে’/ র সংখ্যা প্রকাশ করেন।

"শুধু লক্ষণ-উপসর্গ নিয়ে মা’/ রা গেলেই আমরা বলতে পারি না যে সে ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। এমন দেখা গেছে যে মৃ’/ ত্যু’/ র পর কোভিড রোগী হিসেবে দাফন করা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তীতে পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ এসেছে।"

তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে বাংলাদেশ প্রতিদিন গড়ে ২,০০০ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মা’/ রা যায়।

বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ রোগী যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, এমন তথ্য দিয়ে নাসিমা সুলতানা বলেন, এই রোগের লক্ষণও কোভিড-১৯ উপসর্গের মতো।

তিনি বলেন, মৃ’/ ত্যুর আগে কিংবা পরে - পরীক্ষার মাধ্যমে যখন একজন ব্যক্তির দেহে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া যায়, তখনই সেই তথ্য বুলেটিনে আপডেট করা হয়।

মৃ’/ তদের করোনাভাইরাস নিশ্চিত না
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন বলেন, গত ২রা মে থেকে শুরু করে চার দিনে করোনা বিশেষায়িত ওয়ার্ডে যে ২৮ জন মা’/ রা গেছেন, তাদের মধ্যে চারজনের দেহে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গেছে।

তবে মৃ’/ ত’/ দের মধ্যে বাকি ২৪ জনের করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছিল কি-না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলেই জানালেন হাসপাতালের পরিচালক।

তিনি বলেন, "চারজন পজিটিভ পাওয়া গেছে। বাকি যারা আছেন, তাদের মাল্টিপল কো-মরবিড কন্ডিশন (অন্যান্য রোগ) ছিল। ম্যাক্সিমাম (বেশীরভাগ রোগী) শ্বাসকষ্ট নিয়ে এসেছে, জ্বরও ছিল।"

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন বলেন, মৃ’/ তদের সবাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন কি-না, সেটি তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।

যেহেতু বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ আছে, সেজন্য মৃ’/ ত ব্যক্তিদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি কেন? - বিবিসি’র এমন প্রশ্নে জেনারেল নাসির উদ্দিন অবকাঠামোগত সমস্যার কথা বলেন।

"আমরা যদি এদের টেস্ট করাতে যাই, তাহলে তাদের ডে’/ ড’/ব’/ ডি’/ গুলো রাখতে হবে। দ্যাট ইজ অ্যানাদার ক্রাইসিস (সেটা আরেকটা সংকট)। সে জন্য যারা হাইলি সাসপেক্টেটেড, তাদের ডেডবডি রেখে স্যাম্পল নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।"


কর্তৃপক্ষ বলছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সব মিলিয়ে ১২টি মৃ’/ ত’/ দেহ রাখার ব্যবস্থা আছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছয়তলা বিশিষ্ট পুরনো বার্ন ইউনিট ভবনকে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

এখানে ২৫০ টি শয্যা রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে এখানে ১৫০ জনের মতো রোগী ভর্তি রয়েছে।

হাসপাতালের পরিচালক জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং সন্দেহভাজন - উভয় ধরণের রোগীদের এখানে রাখা হচ্ছে।

যাদের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে তাদের জন্য ভবনটির ৫ম তলা এবং সন্দেহভাজন রোগীদের জন্য ৩য় ও ৪র্থ তলা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

জেনারেল নাসির উদ্দিন বলেন, "উভয় ধরণের রোগীদের এখানে রাখার কারণ হলো, অনেকের করোনার মতো উপসর্গ আছে। তারা অন্য কোন হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। হৃদরোগ হলে শ্বাসকষ্ট হয়, কিডনি রোগী অ্যাডভান্সড স্টেজে থাকলেও শ্বাসকষ্ট হয়।"

"এ ধরণের যত রোগী আছে - যাদের জ্বর এবং শ্বাসকষ্ট আছে - আমরা সবাইকে নেয়ার চেষ্টা করছি। ঢাকা শহরের ক্রিটিকাল রোগীদের একটি বড় অংশ যখন এখানে এসে যাচ্ছে, আমরা তাদের টেস্ট করারও সুযোগ পাই নাই।"

বাস্তবতা হলো, হাসপাতাল কিংবা হাসপাতালের বাইরে - করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে যারা ম/রা যাচ্ছেন, তাদের একটা বড় অংশেরই নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ঘটনা সেটিই প্রমাণ করছে বলেই মনে হচ্ছে।

এ দিকে দেশের অন্যান্য হাসপাতালগুলোর দশাও বেশ একটা ভালো না। বিশেষ করে দেশের এই করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে গিয়েছে। এর অন্যতম কারন হলো দেশের চিকিৎসকদের আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে দ্বিগুন। যার ফলে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের স্থলাভিষিক্ত করা যাচ্ছে না অন্য কাউকেই। আর ঠিক এই সব নানা বিধ কারনেই দেশের করোনার পরিস্থিতি দিন দিন হয়ে যাচ্ছে আরো খারাপ। এ ছাড়াও কমিনিউনিটি স্প্রেড হবার কারনে বাংলাদেশের ভবিষ্যত করোনা পরিস্থিতি ব্যাপক হুমকির শিকার বলে ধারনা করা হচ্ছে।

আরো পড়ুন

Error: No articles to display