বাংলাদেশের ইতিহাসে দুটি নাম সব থেকে বেশি জনপ্রিয়। একটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং অপরজন মেজর জিয়া বা জিয়াউর রহমান। দেশের ইতিহাসের এই দুটি নাম নিয়ে এখনো রয়েছে অনেক বেশ জল্পনা-কল্পনা। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এখনো বেশ কিছু বিষয় অমীমাংসীত রয়েছে। বিশেষ করে তার ’/হ’/ত্যা’/ নিয়ে এখনো রয়েছে নানা ধরনের রহস্য। সম্প্রতি তেমনই একি বিষয় নিয়ে বেড়িয়েছে নতুন একটি লেখা। যেখানে খুশবন্ত সিং নামের একজন তৎকালীন সাংবাদিক লিখেছেন এই লেখা। যেখানে তিনি একবার তার সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন। পাঠকদের উদ্দেশ্যে তার সেই লেখনি তুলে ধরা হলো হুবহু:-
শেখ মুজিবুর রহমান এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুজনের সঙ্গেই আমার অনেকবার সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য হয়েছে। আমার জানামতে শুধু বাঙালি মুসলিম হওয়া ছাড়া তাদের উভয়ের মধ্যে আর কোনো বিষয়ে মিল ছিল না। মুজিবের উচ্চতা ছিল একজন বাঙালির গড় উচ্চতার চেয়ে বেশি, তাঁর ছিল শরীর মাংসল এবং পরনে থাকত ঢিলেঢালা পোশাক। জিয়া আকৃতিতে খাটো, তাঁর শরীর হালকা-পাতলা হলেও গঠন চাবুকের মতো শক্ত। একবার তাঁর দেহরক্ষী আমাকে বলেছিলেন, ’তাঁর এক মুষ্টাঘাত কোনো মানুষকে বেহুঁশ করে ফেলতে পারে।’ মুজিব অত্যন্ত আন্তরিক, উষ্ণ-হৃদয়ের, বহির্মুখী এবং কথা বলতে অভ্যস্ত ছিলেন; জিয়া সুদূরের, গম্ভীর এবং অল্প কথা বলেন। মুজিবের দফতর মুঘল আমলের প্রাচ্যদেশীয় দরবারের মতো : কয়েক ডজন মানুষ কার্পেটের ওপর, সোফা ও চেয়ারের ওপর ছড়িয়ে বসে থাকে, দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে। সারাক্ষণ একটির পর একটি টেলিফোন বাজে; তিনি ফোনে কথা বলার পাশাপাশি উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে যিনিই তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন তার সঙ্গে কথা বলছেন এবং তাঁর সামনে টেবিলে রাখা কাগজপত্রে স্বাক্ষর করছেন। পুরো বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ। জিয়ার অফিস তাঁর মতোই শীতল। ওয়েটিং রুমে তাঁর সচিব ও নিরাপত্তা কর্মীরা বিচক্ষণতার সঙ্গে আপনাকে মার্জিত কথাবার্তার মধ্যে ব্যস্ত রাখেন এবং তাদের সতর্ক দৃষ্টি খুঁজে ফিরে আপনার কাছে কোনো গোপন ’/অ’/স্ত্র/ আছে কিনা। একসঙ্গে একজনের বেশি দর্শনার্থীকে তিনি স্বাগত জানান না এবং সময় মেনে চলেন স্টপওয়াচের মতো। তাঁর রুমে হুট করে অঘোষিতভাবে প্রবেশ করার সাহস কারও নেই। কোনো টেলিফোনও বাজে না। আপনার প্রশ্নগুলো বাতাসে জমে থাকবে; তাঁর নির্দিষ্ট-পরিমিত উত্তর আপনার জমাট প্রশ্নগুলোকে গলাতে পারবে না। মুজিব আপনাকে আলিঙ্গন করবেন এবং দ্বিতীয় সাক্ষাতে আপনার তাঁর ’পুরনো বন্ধু’ বলে সম্বোধন করবেন। জিয়া তাঁর শীতল হাতে আপনার সঙ্গে হাত মেলাবেন এবং চিনতে পারার স্বীকৃতি হিসেবে অস্পষ্ট, ম্লান হাসবেন। মুজিব নিজের সম্পর্কে স্বয়ং তৃতীয় পুরুষে বলেন, ’বঙ্গবন্ধু বলেছেন’, এবং আপনার কাছেও অনুরূপ সম্বোধন আশা করবেন। জিয়া কখনো তাঁর মুখ খোলেন না, অথবা তাঁর সঙ্গে কাউকে খুব ঘনিষ্ঠ হতে দেন না। তিনি সবসময় ’মিস্টার’, ’প্রেসিডেন্ট,’ ’স্যার’ ছিলেন।

জিয়াউর রহমান তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করার দুই বছর পর তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সামরিক একনায়কদের ব্যাপারে আমার আপত্তি ও নেতিবাচক মনোভাব ছিল এবং এমন একজনের প্রতি ভিন্ন ধরনের বিতৃষ্ণা ছিল, যিনি মুজিবের ’/ঘা’/ত’/ক’/দে’/র’/ ’/শা’/স্তি’/ বিধান করার পরিবর্তে তাদের কূটনৈতিক দায়িত্বে ন্যস্ত করার মাধ্যমে পুরস্কৃত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে অতিবাহিত করা সপ্তাহে ঢাকার পরিবেশের যতটুকু দেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে, তাতে আমি অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছি। মাত্র কয়েক বছর আগেও যে এলোমেলো নগরীতে বিরাজ করছিল চরম বিশৃঙ্খলা, সেখানে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় গড়ে ওঠা শপিং সেন্টার ও মার্কেটগুলো দেখে সমৃদ্ধির সুস্পষ্ট লক্ষণ বোঝা যায়। দেশটিতে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ঢাকার বাইরে পল্লীগুলোকে আরও সবুজ, আরও পরিচ্ছন্ন এবং আমি আগে যেমন দেখেছি তার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধশালী মনে হয়েছে। আমি জিয়াকে একথা বলার পর তাঁকে অত্যন্ত সন্তুষ্ট মনে হয় এবং তিনি তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকারের সময় প্রলম্বিত করেন। তাঁর কাছে আমার শেষ প্রশ্ন ছিল তাঁর দেশে ক্রমবর্ধমান ভারতবিরোধী মনোভাব সম্পর্কে। অনেক দেয়ালের ওপর স্লোগান লেখা : ’ভারতীয় কুকুর, হটে যাও’, ’বাংলাদেশের ওপর থেকে হাত গুটিয়ে নাও’। আমি জিয়ার কাছে জানতে চাই যে, তিনি তাঁর দেশে ভারতীয় হস্তক্ষেপের কোনো দৃষ্টান্ত উল্লেখ করতে পারেন কিনা। তিনি যা বলতে পারলেন, তা হলো ভারত সরকার কর্তৃক বাঘা সিদ্দিকী ও শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারকে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান। আমি তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, বঙ্গবন্ধুকে ’/হ’/ত্যা’/ করার জন্য দায়ী একজনকেও কেন গ্রেফতার করা বা শাস্তি প্রদান করা হয়নি? আমার প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করলেন না; বরং অধৈর্যের মতো তাঁর ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন। আমি জানতাম, সাক্ষাৎকারের সময় শেষ হয়েছে।

সেই সন্ধ্যায় আমিই ছিলাম জিয়ার শেষ দর্শনার্থী। করিডোর দিয়ে আমার কয়েক গজ সামনে বিশালদেহী দুজন দেহরক্ষীর অবস্থানের মাঝখান দিয়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছিলেন। তখনই আমি লক্ষ্য করলাম যে আকৃতিতে তিনি কতটা খাটো ছিলেন- পাঁচ ফুটের সামান্য বেশি। তিনি হাই-হিল জুতা পরতেন।

খুশবন্ত সিং ভারতের তৎকালীন সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় একজন সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিকতায় তার ছিল আকশাচুম্বি খ্যাতি। সে সময়ের একটি জনপ্রিয় পত্রিকার একজন সম্পাদক এবং লেখকও ছিলেন তিনি। এছাড়াও ভারতের ’দ্য ন্যাশনাল হেরাল্ড’ ও ’দ্য হিন্দুস্তান টাইমস’ও সম্পাদনা করেছেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের লোকসভার সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন সময়েও দেশের অনেক সংবাদ কভার করেছিলেন তিনি।

আরো পড়ুন

আনুশককার ঘটনায় শেষ পর্যন্ত সত্যটা প্রকাশ পেল

16 January, 2021 | Hits:1892

গেল বেশ কিছু দিন ধরে বাংলাদেশের টক অব দ্যা টাউন হয়ে হয়ে আছে রাজধানীর কলাবাগানের একটি ঘটনা। সেই ঘটনার মূল কেন্দ্রবিন্দুত...

শেষ পর্যন্ত টিকলোই না সেই আলোচিত প্রবাসীর সংসার

17 January, 2021 | Hits:1504

বেশ কিছু দিন আগে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে যায় একটি ঘটনার রেশ। জানা যায় নিজের স্বামী প্রবাসে থাকার সুযোগ নিয়ে স্ত্রী...

হাইকমান্ড থেকে কি বলা হয়েছে কাদের মির্জাকে জানিয়ে দিলেন প্রকাশ্যে

16 January, 2021 | Hits:825

চলছে নোয়াখালীর পৌরসভা নির্বাচন। আর এবারের নির্বাচনে সব টুকু আলো যিনি কেড়ে নিয়েছেন তিনি হলেন বাংলাদেশের সড়ক ও যোগাযোগ মন্...

নৌকার চেয়ে ৮ গুণ বেশি ভোট পেয়ে জয়ী ধানের শীষের প্রার্থী

16 January, 2021 | Hits:633

হবিগঞ্জের মাধবপুরে ঘটে গেছে অবাক করা একটি ঘটনা। আর তা হলো আজকের পৌরসভার নির্বাচনের ফলাফল। জানা গেছে বিএনপির প্রার্থীর কা...

জেতার পর কাদের মির্জাকে ওবায়দুল কাদেরের ফোন

16 January, 2021 | Hits:287

অবশেষে নানা জল্পনা কল্পনার শেষে নির্বাচনে জিতেছেন আলোচিত ব্যক্তিত্ব জনাব কাদের মির্জা। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নির্বাচন নিয়ে ...

কাঁদতে কাঁদতে সোহেল রানা বললেন, অনেক আশা করে এসেছিলাম

17 January, 2021 | Hits:260

প্রতি বছর চলচিত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য সরকারের তরফ থেকে দেয়া হয়ে থাকে জাতীয় পুরষ্কার। আর এই জাতীয় পুরষ্কার প্রতি বছর ...