যুক্তরাষ্ট্রের কলারাডো অঙ্গরাজ্যে এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীকে ’মুসলমান’ বলে দোকান ভাড়া না দেয়ায় পৌনে সাত লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেন মার্কিন নাগরিক।


২০১৭ সালে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী জুনেদ আহমেদ খাঁন ডেনভার শহরে তার দ্বিতীয় রেস্টুরেন্ট খোলার জন্য একজন মার্কিন নাগরিকের দোকান ভাড়া নিতে প্রাথমিক চুক্তিবদ্ধ হন, ওই মার্কিন নাগরিকও দোকানটি ভাড়া নিয়েছিলেন। তবে বাড়ির মালিক তার বাড়ি মুসলমানের কাছে ভাড়া দিতে ওই মার্কিন ভাড়াটিয়াকে নিষেধ করেছিলেন। পরে দোকান মালিক মুসলমানকে ভাড়া দিতে অস্বীকার করেন। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা হলে বাড়ির মালিক বর্ণবাদী আচরণ করায় জুনেদ আহমেদ খাঁন ও তার ছেলের সঙ্গে আপস নিষ্পত্তি করতে বাধ্য হন। ৬ লাখ ৭৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি টাকায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা) দিয়ে রাজি হন বাড়ির মালিক।

জানা যায়, ডেনভারে ২০১৬ সালে একটি বাড়ি ভাড়া নেন ক্রেইগ ক্যাল্ডওয়েল। সেখানে তিনি একটি ফ্রাইড চিকেনের রেস্টুরেন্ট খোলেন। ২০১৭ সালের শেষ দিকে এসে সেটি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন ক্যাল্ডওয়েল। কিন্তু বাড়ির মালিকের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী তাকে হয় নতুন ভাড়াটিয়া খুঁজে দিতে হবে, নয়তো ৫ বছর ভাড়া পরিশোধ করে যেতে হবে। ক্যাল্ডওয়েল তাই নামেন ভাড়াটিয়ার সন্ধানে। পেয়ে যান ভাড়াটিয়া, যিনি সেখানে বাংলা ও ভারতীয় খাবারের খোলার জন্য আগ্রহী।



কিন্তু সমস্যা বাঁধলো ক্যাল্ডওয়েল যখন বাড়ির মালিক ক্যাটিনা গ্যাচিসকে তাদের পরিচয় দিলেন। মুসলিম শোনার পর তিনি ভাড়ার চুক্তিতে অনুমোদন দেয়ার বিষয়ে আর কোনো আগ্রহ দেখালেন না। ৭১ বছর বয়সী ক্যাল্ডওয়েল বলেন, ’বিষয়টি আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমাকে কেউ বিশ্বাস করবে, সেটাও মনে হচ্ছিল না।’

এক সপ্তাহ পর ক্যাল্ডওয়েল আবারও গেলেন তার বাড়ির মালিকের কাছে। এবার তিনি কথোপকথন রেকর্ড করেন মোবাইলের অ্যাপ ব্যবহার করে।

ক্যাটিনা এ সময় তাকে বলেন, ’আমি অ্যামেরিকান চাই, যে তোমার আর আমার মতো ভালো।’ ক্যাল্ডওয়েল পরে আবার তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি বলেন, ’তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মুসলিম ধরে নিয়ে আসছে এখানে। আর সেকারণে আমি নানা সমস্যায় পড়ছি।’

পরবর্তীতে নিজের আইনজীবীর পরামর্শে বিষয়টি নিয়ে আদালতে যান ক্যাল্ডওয়েল। সেখানে ক্যাটিনা গ্যাচিসও তার এই কথোপকথনের কথা স্বীকার করেন।

গ্যাচিসের কথায় অবশ্য খুব একটা আশ্চর্য হননি রাশাদের বাবা। কিন্তু নাম শুনেই তার গোটা জীবনকে পরিমাপ করে ফেলার বিষয়টিকে হালকাভাবে নিতে পারেননি রাশাদ। তিনি বলেন, ’আমার ভীষণ রাগ হয়েছিল। মর্মাহত হয়েছিলাম। ব্যাপারটি নিয়ে আমার নিজের মধ্যেই সন্দেহ তৈরি হয়। আরও কেউ কি এভাবে চিন্তা করে, নাকি শুধু এই নারী?

আদালতে বিষয়টি গড়ানোর পর স্থানীয় গণমাধ্যমেও এই খবর আসে। ওই বাড়ির মালিকের ব্যবসা প্রত্যাখ্যানের হিড়িক ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

গত এপ্রিলে আদালতে দুই পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। সে অনুযায়ী বাড়ির মালিককে তার আচরণের জন্য ৬ লাখ ৭৫ হাজার ডলার দিতে হবে বাদীদের, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এক বছর মামলা চলার পর এটিকে বড় ধরনের স্বস্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাশাদ। বলেন, ’আমি আর আমার বাবা শুধু দেখতে চেয়েছিলাম যে, বিচার বলে কিছু আছে, যার কারণে এই নারী এমনটি করতে পারেন না।’

উল্লেখ্য, সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার দাড়িপাতন গ্রামের জুনেদ আহমেদ খাঁন প্রায় ৩৫ বছর আগে আমেরিকায় যান। অ্যাভিয়েশনে স্নাতক করার পর কলোরাডোতে আমেরিকান এয়ারফোর্স ডিভিশনের অধীনে চাকরি শুরু করেন। কয়েক বছর চাকরির পর স্বাধীনচেতা জুনেদ খাঁন কলোরাডোতে রেস্তোরাঁ ব্যবসা শুরু করেন। অল্পদিনের মধ্যেই তার ব্যবসায় সাফল্য আসতে থাকে। নিজের পারদর্শিতায় একে একে ১৭টি ’কারি অ্যান্ড কাবাব রেস্টুরেন্ট’–এর শাখা বিস্তৃত করতে সক্ষম হন। ১৭টি রেস্তোরাঁ পরিচালনায় এক সময় হাঁপিয়ে ওঠেন তিনি। কারিগর বা কর্মী সমস্যার ভোগান্তিতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল তাকে। একপর্যায়ে রেস্তোরাঁ বিক্রি করে দেন। কয়েক বছর ধরে ছেলে রাসাদ খাঁনকে দিয়ে আবার রেস্তোরাঁ ব্যবসা শুরু করেন। অ্যারিজোনা কলোরাডোতে ’কারি অ্যান্ড কাবাব’ বিখ্যাত ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ হিসেবে খ্যাতি পায়।

এদিকে, ১১ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে যান তার ছেলে রাশাদ খাঁন। বাবার সঙ্গে ব্যবসায় নামার আগে কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য প্রযুক্তিতে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।


সূত্র:জাগো নিউজ ২৪