দেনমোহর দাবি করার পর স্বামী তা পরিশোধ না করলে স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে পৃথক থাকতে পারবেন এবং ওই অবস্থায় স্বামী অবশ্যই তাঁর ভরণপোষণ করতে বাধ্য থাকবেন। সাধারণত বিয়ের সময় দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়। দেনমোহরের কিছু পরিমাণ বিয়ের সময় তাৎক্ষণিক দেনমোহর হিসেবে দেওয়া হয় এবং তা কাবিননামায় লিখিত থাকে। বাকিটা বিলম্বিত দেনমোহর হিসেবে ধরা হয়।
এক্ষেত্রে যা করা উচিত তা হলো
১. স্বামী দেনমোহর দিতে অস্বীকার করলে স্ত্রী তা আদায়ের জন্য আদালতে মামলা করতে পারেন।
২. তাৎক্ষণিক দেনমোহর চাওয়ার পর স্বামী তা দিতে অস্বীকার করলে ৩ বছরের মধ্যে পারিবারিক আদালতে তাৎক্ষণিক দেনমোহর আদায়ের জন্য মামলা করতে হবে।
৩. বিলম্বিত দেনমোহর আদায়ের ক্ষেত্রে যেহেতু সময়সীমা বাঁধা নেই ফলে স্বামী বা স্ত্রী তালাক দিলে অথবা স্বামী মৃত্যুবরণ করলে পারিবারিক আদালতে ৩ বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
৪. তালাক হয়ে গেলে স্ত্রীকে স্বামীর দেনমোহরের টাকা বা সম্পত্তি দিতে হবে।
যদি কোনো স্ত্রী স্বামীর কাছে নির্ধারিত দেনমোহর চেয়ে না পায়,তবে সেই স্ত্রী নিম্নলিখিত কাজগুলো করতে পারে। যেমন –
৫. স্বামীর সাথে বসবাস করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে
৬. দাম্পত্য মিলনে অনীহা প্রকাশ করতে পারে
৭. পৃথকভাবে দূরে বসবাস করতে পারে ।
এ সময় স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে। এসময় কোন স্বামী যদি দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য মামলা করে, তবে তার মামলা খারিজ হয়ে যাবে, কারণ স্বামী, স্ত্রীর দাবি অনুযায়ী দেনমোহর পরিশোধ করেনি।
দেনমোহর সংক্রান্ত মামলা কোথায় দায়ের করা যায় ?
দেনমোহর সংক্রান্ত মামলা স্থানীয় সহকারী জজ আদালত যা পারিবারিক আদালত নামে পরিচিত, সেখানে করা যায়। এ আদালত ১৯৮৫ সাল থেকে পারিবারিক আদালত হিসেবে কাজ করছে। স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন সে এলাকার পারিবারিক আদালতে দেনমোহর সংক্রান্ত মামলা করতে পারেন। বিবাহবিচ্ছেদ হলে বা বিলম্বিত তালাক হলে অথবা স্বামীর মৃত্যু হলে কোনো স্ত্রী তাঁর বিলম্বিত দেনমোহর আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করে তা আদায় করতে পারেন। তবে তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
স্বামী মারা যাবার পর স্ত্রী কিভাবে দেনমোহর দাবী করতে পারে ?
স্বামীর মৃত্যু হলে বকেয়া দেনমোহর ঋণের মতো হয়। এটি অবশ্যই শোধ করতে হয়। স্বামীর উত্তরাধিকারীরা এটি প্রদানে বাধ্য। অন্যথায় মৃত স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে তা আদায় করা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর দেনমোহর স্ত্রীর কাছে স্বামীর ঋণ হিসেবে ধরা হবে।
১. স্বামীর মৃত্যুর পর দাফন, কাফন ও অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি শেষ হবার পর স্বামীর অন্যান্য ঋণ পরিশোধ করার সময় স্ত্রী দেনমোহর দাবী করতে পারেন।
২. স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।
৩. যদি স্বামীর উত্তরাধিকারীরা স্বামীর সম্পত্তি থেকে দেনমোহর দিতে অস্বীকার করেন তাহলে স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারবেন।
উল্লেখ্য, যদি স্বামীর আগে স্ত্রীর মৃত্যু হয় এবং স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধিত না হয়ে থাকে তাহলে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা ঐ দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী। ফলে স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা দেনমোহর পাওয়ার জন্য আদালতে মামলা করতে পারবেন।
স্ত্রী কি স্বামীর সম্পত্তি দখলে রেখে দেনমোহর আদায় করতে পারেন ?
স্বামী দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি নিজ দখলে রাখতে পারেন। স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় কোন স্ত্রী কোন সম্পত্তি দখলে রাখলে এবং স্বামীর মৃত্যু পর স্ত্রী ঐ সম্পত্তির দখল ভোগ করতে থাকলে, তার দখলটি বৈধ ও আইনসম্মত হবে। স্ত্রী দখলকৃত সম্পত্তির খাজনা, লাভ বা আয় থেকে দেনমোহরের টাকা আদায় করতে পারবে। এ সময়ে কেউ তাকে দখল থেকে উচ্ছেদ করতে চাইলে, সে দখল উদ্ধারের মামলা করতে পারবে।
কখন দেনমোহরের অর্ধেক দিতে হবে ?
বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য মিলন অর্থাৎ সহবাসের আগে বিবাহবিচ্ছেদ হলে কিংবা স্বামীর মৃত্যু হলে সম্পূর্ণ দেনমোহরের অর্ধেক পরিশোধ করতে হবে।
মনে রাখা প্রয়োজন দেনমোহর ও ভরণপোষণ সম্পূর্ণ আলাদা। দেনমোহরের সাথে ভরণপোষণের কোন সম্পর্ক নেই। বিবাহিত অবস্থায় স্ত্রীকে ভরনপোষনের জন্য স্বামীর যে খরচ তা কোনভাবেই দেনমোহরের অংশ বলে বিবেচিত হবে না। আবার বিয়ে-বিচ্ছেদের ফলে স্বামী, স্ত্রীকে যে ভরণপোষণ দেয় তাও দেনমোহরের অংশ নয়। দেনমোহর এবং ভরণপোষণ দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। একটি পরিশোধ করলে অপরটি মাফ হয়ে যায় না। বিয়ের সময় দেয়া শাড়ি, গয়না, কসমেটিকস্ কখনোই দেনমোহরের অংশ নয়। বিয়ের সময় স্বামী বা তার পরিবার কর্তৃক স্ত্রীকে দেয়া উপহার দেনমোহর হিসেবে বিবেচিত হবে না। মনে রাখতে হবে যে, উপহার উপহারই; দেনমোহর নয়। অনেক সময় বিয়ের কাবিন নামায় শাড়ি, গয়নার মূল্য ধরে দেনমোহরের একটি অংশকে উসুল ধরা হয়। এটা ঠিক নয়। দেনমোহর স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে দেয়া কিছু অর্থ বা মূল্যবান সম্পদকে বোঝাবে, অন্য কিছু নয়। যদি কাবিননামায় দেনমোহর হিসেবে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দেয়ার কথা উল্লেখ না থাকে তবে স্ত্রীকে উপহার হিসেবে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দিলে তা দেনমোহর হিসেবে পরিশোধ হবে না। এক্ষেত্রে "দেনমোহর বাবদ" কথাটি লেখা থাকতে হবে। যেমন জমি হস্তান্তর দলিলে "দেনমোহর বাবদ" কথাটি লেখা না থাকলে এরূপ জমি-দেনমোহর হিসেবে ধরা হবে না। স্বামী স্ত্রীকে কোনো উপহার দিলে তা দেনমোহর বলে বিবেচিত হবে না। বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীকে অনেক কিছুই দিতে পারে। স্বামী যদি দেনমোহর হিসেবে স্ত্রীকে কিছু দেয়, তবেই তা দেনমোহর বলে বিবেচিত হবে।
জনসচেতনায়- মোঃ সাব্বির রহমান, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত), বাঞ্ছারামপুর মডেল থানা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।