শেখ হাসিনা শেষমুহূর্ত হলেও সরকারপ্রধান থেকে সরে দাঁড়িয়ে চমক দেখাবেন : আবদুর রব আ স ম রব বলেন, দেশ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আওয়ামী লীগ সরকার ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানি কায়দায় দেশ চালাচ্ছে। পাকিস্তানিরা বিশ্বাস করত বাঙালিরা দেশ চালানোর উপযোগী নয়। সুতরাং কোনো অধিকার তাদের প্রাপ্য নয়। ক্ষমতা শুধু পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য সংরক্ষিত। আওয়ামী লীগও মনে করে, দেশ চালানোর অধিকার শুধু আওয়ামী লীগের- অন্য কারও নেই।
তিনি বলেন, আইয়ুব খানের দর্শন নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে একবিংশ শতাব্দীতে রাজনীতি করছে আওয়ামী লীগ। আইয়ুব খানের উন্নয়নের দশক বীর বাঙালিরা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। এদেশে আওয়ামী লীগ সেই আইয়ুব খান মডেল পুনরুজ্জীবিত করেছে। মনে রাখতে হবে, ভোটারবিহীন-ন্যায়বিচারবিহীন রাষ্ট্র আর বেশি দিন চলতে পারে না। এ থেকে উত্তরণের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় ঐক্য যতবার সৃষ্টি হয়েছে, ততবার বাঙালি বিজয়ী হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ঐকমত্যের সরকারের মন্ত্রী আ স ম আবদুর রব প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। ছিলেন ডাকসুর ভিপি। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৬০ বছর ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আ স ম রব।
সম্প্রতি তার নেতৃত্বাধীন জেএসডি, সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা বাংলাদেশ এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট নামে একটি জোট গঠিত হয়। এ জোটের সঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম মিলে সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।
এ অবস্থায় বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা, বিএনপির সঙ্গে জোট গঠন, জামায়াতে ইসলামীকে মেনে নেয়া না-নেয়া, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এ থেকে উত্তরণ, আগামী নির্বাচন, বর্তমান সরকারের অধীনে এবং সংসদ বহাল রেখে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে অংশগ্রহণ করা না-করাসহ নানা ইস্যুতে এই প্রতিবেদকের  সঙ্গে কথা হয় আ স ম আবদুর রবের। এসব বিষয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেন। নিজের মতামত তুলে ধরেন। উত্তরায় বাসায় বসে নেয়া এই সাক্ষাৎকারের পুরো বিবরণ দেয়া হল।
প্রশ্ন : আপনার দৃষ্টিতে দেশের বর্তমান অবস্থা এখন কেমন? কী মনে হয় আপনার?
রব : রাষ্ট্র এখন গণতন্ত্র-সুশাসন-নিরাপত্তা প্রশ্নে ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে সংকটাপন্ন। দলীয় ক্ষমতার স্বার্থে ৪৬ বছর ধরে রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রকে আলাদা করা হয়েছে। আর কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্র থেকে জনগণের মালিকানা ছিনতাই করা হয়েছে। জনগণকে বাদ দিয়ে, জনগণের অভিমতকে উপেক্ষা করে, জনগণকে ক্রীতদাসে পরিণত করা হয়েছে। দুঃখজনক হচ্ছে- জনগণের ভোটবিহীন-সম্মতিবিহীন রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে সরকারকে ক্রমাগত বেআইনি, অনৈতিক, অসাংবিধানিক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত বল প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হচ্ছে। এই বল প্রয়োগ, দমন-নিপীড়ন, ভিন্ন মত-পথকে নির্মূল করা, আন্দোলনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ আবিষ্কার- সব পাকিস্তানি শাসনামলের মানসিকতা। পাকিস্তানিরা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ যারাই বাঙালির অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছেন, তাদের রাষ্ট্রদ্রোহী-ষড়যন্ত্রকারী দেশবিরোধী আখ্যায়িত করে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চেয়েছেন। আজ আওয়ামী লীগও তাদের অবৈধ, স্বৈরাচারী ও বেআইনি শাসনের বিরুদ্ধে যারাই কথা বলে, তাদের ষড়যন্ত্রকারী-দেশবিরোধী বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
প্রশ্ন : এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? আদৌ কি উত্তরণ সম্ভব, আপনি কী মনে করেন?
রব : বিদ্যমান বাস্তবতায় গণজাগরণ-গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন সৃষ্টি হচ্ছে। রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে যে অবক্ষয়-অন্যায়-নির্মমতা প্রতিফলিত হচ্ছে, সত্যকে যেভাবে বিতাড়িত করা হচ্ছে, মানবতাকে যেভাবে লুণ্ঠিত করা হচ্ছে, তা শুধু ক্ষমতার পালাবদলে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না। এর জন্য সমাজের রূপান্তর প্রয়োজন। এ রূপান্তরের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে জেএসডির ১০ দফা এবং রাজনৈতিক দার্শনিক সিরাজুল আলম খানের ১৪ দফা প্রণীত হয়েছে। ঔপনিবেশিক রাজনীতির অবসানকল্পে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নতুন সমাজ শক্তির উদ্ভব ঘটবে। এই নবতর শক্তির নবজাগরণ অধঃপতিত রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটাবে, উন্নয়ন-উৎপাদনে নতুন মাত্রা যুক্ত করবে। রাষ্ট্র কাঠামোতে পরিবর্তন- ’৭২-এর সংবিধানের সংশোধন, ঔপনিবেশিক আইনকানুনের পরিবর্তন করে যুগের চাহিদা এবং একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক রাজনীতি বিবেচনায় এক নতুন শক্তির উত্থান হবে। এ নতুন শক্তিই জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে বিদ্যমান পচনকৃত রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবসান করে, নতুন রাজনৈতিক শাসনপদ্ধতি প্রবর্তন করে এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাবে এবং রাষ্ট্র হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক, মানবিক ও নৈতিক রাষ্ট্র।
প্রশ্ন : শেখ হাসিনাকে সরকারপ্রধান রেখে এবং বর্তমান সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হলে কি তা আদৌ গ্রহণযোগ্যতা পাবে? আপনারা কি শেখ হাসিনার অধীনে এবং সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনে যাবেন?
রব : বিচারপতি কে এম হাসান অতীতে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তাকে মেনে নেননি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এখনও শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বিদ্যমান। সুতরাং তার নেতৃত্বে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে, তা যেমন অন্যান্য দল বিশ্বাস করতে পারে না, তেমনি শেখ হাসিনার বিশ্বাসের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই নিরপেক্ষ হয় না, তা গত পাঁচ বছরে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ভোটের অধিকারকে পাকিস্তানিরা সম্মান করেনি বলে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সুতরাং আজকের প্রধানমন্ত্রীর দায় ও কর্তৃব্য হচ্ছে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য নিজের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা। আমি বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনা শেষমুহূর্ত হলেও সরকারপ্রধান থেকে সরে দাঁড়িয়ে চমক দেখাবেন।
প্রশ্ন : শোনা যাচ্ছে আপনারা একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছেন। এ ঐক্যে কি বিএনপিও থাকবে? থাকলে এই ঐক্যের রূপরেখা কী হবে?
রব : বাংলাদেশকে তার আপন গতিপথ ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে। রাষ্ট্র এখন আর সবার জন্য নয়- কারও কারও জন্য। সুতরাং রাষ্ট্রকে লুণ্ঠন বা ডাকাতি করার জন্য কারও কারও অসীম ক্ষমতা-ঔদ্ধত্যকে জনগণের প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রতিহত করে দিতে হবে। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত যে মাটিতে, সেখানে কারও কারও নর্তন-কুর্দন জনগণ বেশিদিন মেনে নেবে না, সে যে-ই হোক। সুতরাং জনগণের বৃহত্তর ঐক্য এখন সময়ের দাবি। এ দাবি যদি আমরা পূরণ করাতে না পারি দলীয় সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে, তাহলে জাতিকে বড় খেসারত দিতে হবে।
প্রশ্ন: যদি বৃহত্তর ঐক্য করেন, এক্ষেত্রে আপনার বা আপনাদের পক্ষ থেকে কোনো রোডম্যাপ কিংবা অভিন্ন রূপরেখা দেয়া হবে কি না?
রব : ঐক্যের প্রয়োজন হচ্ছে জাতীয় রাজনীতির বৃহত্তর স্বার্থে। ভিন্ন ভিন্ন রূপরেখা থেকেও অভিন্ন রূপরেখা করা যেতে পারে, ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে থেকেও ঐক্য হতে পারে আর এক অবস্থানে থেকেও ঐক্য হতে পারে। দেশ-জনগণের স্বার্থে যদি প্রাধান্য পায়- বহু ফর্মুলা উদ্ভাবিত হতে পারে সময়ের নিরিখে, লক্ষ্যের নিরিখে। আর এবারের পরিবর্তন শুধু পরিবর্তনের জন্য নয়, এবারের পরিবর্তন হবে মৌলিক-কাঠামোগত পরিবর্তন।
প্রশ্ন: এ ঐক্যে কি জামায়াতও থাকবে?
রব : ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা বিরোধিতা করেছিল তাদের বাদ দিয়ে যদি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা যায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের রাজনীতিতেও তাদের প্রয়োজন পড়বে না।
প্রশ্ন: সরকারি দলের নেতারা দাবি করছেন তারা আগের চেয়ে এখন আরও বেশি শক্তিশালী। আগামী নির্বচনেও তারা জয়ী হবেন এবং সরকার গঠন করবেন। আপনি কী মনে করেন?
রব : জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে তাদের যেভাবে অপমান করা হয়েছে, সেই অপমানের জবাব সুষ্ঠু ভোট হলে সরকার পাবে। ছাত্রদের কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে কিশোর আন্দোলনে সমাজ থেকে যে চেতনার উন্মেষ ঘটেছে, ছাত্রছাত্রীরা যে নতুন বার্তা দিয়েছে, সরকার তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ছাত্রদের রশি দিয়ে বেঁধে কারাগারে পাঠিয়েছে। রিমান্ডের নামে নির্যাতন চালিয়েছে এবং ছাত্রলীগ দিয়ে নির্যাতন করিয়েছে। তার জবাব একদিন জনগণ দেবে। যে ছাত্ররা ভাষা আন্দোলন করেছে, গণঅভ্যুত্থান করে কারাগার থেকে শেখ মুজিবকে মুক্ত করে এনে বঙ্গবন্ধু বানিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ করেছে, সে ছাত্রদের নির্যাতন করে কারাগারে নিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বপ্ন একদিন ধ্বংস হবে।
প্রশ্ন : সংসদ বহাল রেখে সরকারি দলের অধীনে নির্বাচন হলে তা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে? আপনারা কি এ অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নেবেন?
রব : সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের জন্য সাংঘর্ষিক। এক সংসদ রেখে আরেক সংসদ নির্বাচন এবং একজন সংসদ সদস্য হিসেবে প্রার্থী, আরেকজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রার্থী- এগুলো নিরপেক্ষ নির্বাচনের অন্তরায়। খেয়াল করে দেখবেন, এ সরকার যতগুলো স্তরের নির্বাচন করেছে, কোনোটারই গ্রহণযোগ্যতা নেই। গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার শক্তি-সাহস-সামর্থ্য আর আওয়ামী লীগের নেই। আওয়ামী লীগে রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার, নির্বাচনে কারচুপি, কূটকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করা ছাড়া নিরপেক্ষ নির্বাচন স্বপ্নেও দেখতে পারবে না। কারণ তারা জানে, নিরপেক্ষ নির্বাচনের ফল কী ভয়ংকর হতে পারে। এ অবস্থায় আমরা কী করব, সময়ই বলে দেবে। আগাম মন্তব্য করা কঠিন।
প্রশ্ন: নির্বাচনে গেলে আপনাদের প্রস্তুতি কী? আপনারা এককভাবে নাকি জোটগতভাবে নির্বাচন করবেন?
রব : দলগতভাবে-জোটবদ্ধভাবে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে যেতে পারি। যদি জনগণের ভোটাধিকারের সুযোগ থাকে।
প্রশ্ন: আগামী দিনে কী ধরনের সরকার দেখতে চান?
রব : জনগণের সরকার। জনগণের পক্ষে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, যার ভিত্তি হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ’সাম্য’, ’মানবিক মর্যাদা’ ও ’সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠা করাই হবে সরকারের নৈতিক কর্তব্য। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার বিনষ্ট হতে পারে- এমন কোনো পদক্ষেপ বা আইন প্রণয়ন করতে পারবে না। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এ অঙ্গীকারই ঘোষিত হয়েছে। সব আইনের ভিত্তি হবে এই তিন দর্শন।
প্রশ্ন : বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার যে উদ্যোগ আপনি নিয়েছিলেন, তা কি এখনও আছে? নাকি থেমে গেছে?
রব : এ উদ্যোগ চলছে-চলবে।
প্রশ্ন : আপনাকে ধন্যবাদ।
রব : আপনাকেও ধন্যবাদ।
(সাক্ষাৎকারটি যুগান্তর থেকে সংগৃহীত)amadershomoy