তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা অার বর্তমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন একই বলে মত দিয়েছেন বিশিষ্টিজনেরা। সেই ৫৭ ধারায় গত বছর মামলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে।
শুক্রবার সেই ৫৭ ধারার মামলা নিয়ে নিজের করুণ অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।
আসিফ নজরুলের ভাষায়, গত বছর আমার বিরুদ্ধে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হয়। মামলাটি করা হয় ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একজন মন্ত্রী সম্পর্কে মন্তব্যের কারণে। আমার নাম অসত্ভাবে ব্যবহার করে উক্ত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। এটি আমি আমার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে মামলার অনেক আগে থেকে নিয়মিতভাবে জানিয়ে আসছিলাম। এমনকি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে আমি থানায় গিয়ে জিডিও করে আসি একসময়।
তারপরও মামলাটি করেন উক্ত মন্ত্রীর ভাইয়ের ছেলে। তিনি মন্ত্রীর এলাকার একজন স্থানীয় নেতাও। মামলা দায়েরের কয়েক দিন আগে মন্ত্রী নিজে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন টেলিভিশন টক শোতে। মামলা দায়েরের আগে–পরে উক্ত টক শোর উপস্থাপক মুহিউদ্দিন খালেদ এবং তৃতীয় মাত্রার উপস্থাপক জিল্লুর রহমান মন্ত্রীকে জানান যে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি আমার নয়। আমি নিজে পরিচিত এই মন্ত্রীকে মোবাইল ফোনে বিস্তারিত মেসেজ পাঠিয়ে বিষয়টি জানাই। তারপরও সম্পূর্ণ হয়রানিমূলকভাবে প্রথমে মানহানি এবং পরে ৫৭ ধারায় মামলাটি করা হয়।
৫৭ ধারায় মামলা হওয়ামাত্র পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে। মামলার খবর শুনে তাই দুশ্চিন্তায় পড়ি আমার ছোট সন্তানদের নিয়ে। আমার চার সন্তানকে নিয়মিতভাবে স্কুলে দেওয়া-নেওয়ার কাজটি করি আমি। আমি গ্রেপ্তার হলে তাদের স্কুলের কী হবে? বাসার অন্য কাজগুলো কে করবে? আমার স্ত্রী কনসালটেন্সির কাজ সেরে বাসায় ফেরে সন্ধ্যায়। আমি গ্রেপ্তার হলে সে একা কীভাবে সামলাবে সবকিছু? গ্রেপ্তার হলে আমার ছাত্রছাত্রীদের কী হবে?
মামলার খবর আমার পরিবারকেও বিপর্যস্ত করে ফেলে। এটি শোনামাত্র আমার স্ত্রী সব ফেলে বাসায় ছুটে আসে। উদ্বিগ্ন হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে আইনজীবীর কাছে, উচ্চ আদালতে। আমার ১১ বছরের মেয়ে জানতে চায়, ’তুমি কী করেছ?’ আমি বললাম, ’কিছু করিনি মা।’ সে অবাক হয়ে বলে: ’তাহলে গ্রেপ্তার করবে কেন?’
আমি মুষড়ে পড়ি। একজন বালিকাকে কী উত্তর দেওয়া যেত এর?
আইসিটি ৫৭ ধারার চাইতে বর্তমান ডিজিটাল আইন আরো ভয়াবহ ‍উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, সব জেনেবুঝে আমার সন্দেহ নেই যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারের অন্যায়ের সমালোচনাকারীদের আর ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা বা এর আতঙ্কে রাখা। এবং এভাবে দেশকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া।
এই আইনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতসহ বিভিন্ন ফোরামে অধিকারসচেতন মানুষকে অবিলম্বে রুখে দাঁড়াতে হবে।
প্রসঙ্গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিলটি পাস হয়। আইনটি কার্যকর হলে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল হবে। তবে এই আইনটিতেই বিতর্কিত ৫৭ ধারার বিষয়গুলো চারটি ধারায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশকে পরোয়ানা ও কারও অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই আইনে ঢোকানো হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের সমালোচিত আইন ’অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’। আইনের ১৪টি ধারার অপরাধ হবে অজামিনযোগ্য। বিশ্বের যেকোনো জায়গায় বসে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক এই আইন লঙ্ঘন হয়, এমন অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে এই আইনে বিচার করা যাবে।