দূরদর্শিতার অভাব বিএনপি-কে আজ এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে। এরশাদ দেশ থেকে রাজবন্দি ব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়েছিল। সবাইকে দেখাতে চেয়েছিল যে সে বিরোধী রাজনীতি করার জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করবে না। তার বদলে শুরু হয়েছিল বিরোধী নেতা-কর্মীদের নামে ছাগল চুরির মামলা দেওয়া, কাঁটাচামচ চুরির মামলা দেওয়া, যৌন হয়রানির মামলা দেওয়া, কলাগাছের কাঁদি কেটে নেওয়ার মামলা দেওয়া, সন্ত্রাসের মামলা দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই ধারাতেই এখন মামলা খাচ্ছে বিএনপি। আওয়ামী লীগও অবশ্য এইসব ধারায় মামলা খেয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হয়তো খাবে। কিন্তু বিএনপি তো দুই টার্ম ক্ষমতায় ছিল। তারা তখন রাজবন্দির বিধান ফিরিয়ে আনার কথা ভাবেইনি মোটেই।
এখন সংলাপের কথায় আসি। সংলাপে বিএনপি সন্তুষ্ট নয়। ড. কামাল হোসেনও জানিয়েছেন যে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশে বাধা না দেওয়ার আশ্বাস ছাড়া তাঁরা আর কোনো কিছু অর্জন করতে পারেননি সংলাপ থেকে। তবে তিনি মনে করছেন, সংলাপ হওয়াটাই একটি ইতিবাচক দিক। তাঁর স্ট্রাটেজি হচ্ছে সরকারের কাছ থেকে বিএনপিসহ সব দলের কর্মীদের কাজ করার সুযোগ আদায় করে নিয়ে আগামী নির্বাচনে বিরোধী দলকে জিতিয়ে আনা। তিনি জানেন যে সরকার ৭ দফার কোনোটাই হয়তো পুরোপুরি মানবে না। তবু যে বিরোধী দলকে জিতিয়ে আনা সম্ভব, তার অনেক উদাহরণ আছে অতীতে।
কিন্তু বিএনপি এত অসন্তুষ্ট কেন? তারা কি মনে করেছিল সরকার খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়াকে মুক্তি দেবে সংলাপের মাধ্যমে? যদি মনে করে থাকে তাহলে বলতেই হবে, এতদিনেও কিছুমাত্র শিক্ষা হয়নি তাদের।



গঠনের মুহূর্ত থেকে আওয়ামী লীগ নানাভাবে বিএনপি-কে ঐক্যজোটের ব্যাপারে অনীহ এবং সন্দিহান করে তোলার চেষ্টা করে আসছে। আর বিএনপি-র অনেক ছোট-বড় নেতা মনে করে যে ড. কামাল হোসেনকে মুরুব্বি মানা তাদের জন্য অপমানকর। নিজেরা তারা একটা কর্মসূচি দিতে পারে না, গর্ত থেকে মুখ বের করতে পারে না। তাদের জন্য একটা সুযোগ যে তৈরি করে দিতে পারেন কেবলমাত্র ড. কামাল হোসেনই, এটুকু বোঝার মতো বুদ্ধিও তাদের ঘটে নেই।

এখন গোস্বা করে তারা যদি ঐক্যজোট ভেঙে বেরিয়ে যায়, তাহলে নির্বাচন করার সুযোগ তারা পাবে কি না সন্দেহ। অনেকেই ড. কামাল হোসেনকে ভোটের নিরিখে টোকাই আখ্যা দেয়। বাস্তবতা হচ্ছে, এই দেশে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া ছাড়া ভোটের বাজারে সবাই টোকাই। হাসিনা-খালেদা যদি কাউকে নমিনেশন না দেন, তাহলে যত বড় নেতাই হোক, ভোট জুটবে তার কয়েকশো। তার কথা কেবলমাত্র বউ-শালি ছাড়া ভুলে যাবে সবাই।

ড. কামালের নিজস্ব অবস্থান আছে। শেখ হাসিনার কাছ থেকে সরে গিয়ে তিনি হারিয়ে যাননি। কিন্তু বিএনপির বিপ্লবী আপোসহীন নেতারা যদি আর কিছুদিন ক্ষমতার বাইরে থাকেন, তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না কোথাও।

আবারও তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনার একটাই পথ আছে তাদের সামনে। তা হচ্ছে নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের মাধ্যমে। সেটি ড. কামালের অভিভাবকত্ব ছাড়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। একথা বিএনপি না বুঝলেও আওয়ামী লীগ ঠিকই বোঝে।

আর বিএনপি যদি ভোটে না-ও জেতে, তবু সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসাবে অবস্থান নিতে পারলেও দেশবাসী অন্তত আওয়ামী লীগের আরো বিকট দানব হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা পাবে।

[২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে আমরা মেনে নিয়েছিলাম আগুন-অশান্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য। তবে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম যে আওয়ামী লীগ আরো দানব হয়ে উঠতে পারে। সেই আশঙ্কা গত ৫ বছর সত্যি বলেই প্রমাণিত হয়ে আসছে।]

(জাকির তালুকদার