যুক্তফ্রন্ট থেকে ঐক্যফ্রন্ট। রাজনীতির মাঠে প্রবীণের গায়ে চেপে নবীন এক জোটের আগমন, যার নেতৃত্বে আছেন তিনি প্রথিতযশা আইনজীবী ও সংবিধান প্রণেতাদের একজন ড. কামাল হোসেন। দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সংবিধানের সঙ্গে জুড়ে আছে তার নাম। বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদপুষ্ট সেদিনের সেই তরুণ এখন এই ২০১৮ সালে এসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে উঠেছে। আমরা সবাই জানি ড. কামাল একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির একজন ছিলেন এবং বেশ প্রভাবের সাথেই ছিলেন। পরবর্তীতে ৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকেই তিনি যেন ধীরে ধীরে নিরব হতে থাকলেন। শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানার অসহায় দিনগুলোতে প্রশ্নবোধক চিহ্নযুক্ত বঙ্গবন্ধুর এই বিশেষ সৈনিকের অবস্থান এখন সবারই জানা।
আওয়ামী লীগের রাজনীতি ত্যাগ করেছেন, গড়ে তুলেছিলেন নিজের দল। সফল হতে পারেননি। নির্বাচনেও নেই সফলতা। ২০১৩ সাল থেকে যখন যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিতে গোটা বিশ্বের বাঙালিরা সোচ্চার তখন তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন তার জামাতা ডেভিড বার্গম্যানকে, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে জামায়াতের সঙ্গে সখ্যের।  
ড. কামাল হোসেন যদি সত্যিকার অর্থেই একজন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক হতেন এবং বুকে যদি তিনি বাংলাদেশকে ধারণ করতেন, তাহলে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে বার্গম্যানের অবস্থান মেনে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। অবশ্য তাকে আমি কখনোই সরাসরি যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে কিছু বলতে বা বিচারের পক্ষে তার কোনও বক্তব্য শুনতে পাইনি। তাই এ কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না যে তিনি একজন প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ছিলেন এবং আছেন। সরাসরি যেমন কখনও বিপক্ষে বলেননি তেমনি কখনও সরাসরি পক্ষেও বলেননি। খুব কৌশলে নিজের অবস্থানকে একরকম ধোঁয়াশার মধ্যেই রেখেছেন। আর এই কারণেই তেমন একটা আলোচনায় আসেননি কখনও।
তবে বিষয়টা মনে হয় তিনি আর চেপে রাখতে পারছেন না। একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে ড. কামালের ভূমিকা ক্রমশ সন্দেহজনক হয়ে উঠছে। তিনি শুরু করেছিলেন দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার শপথ নিয়ে। একজন জ্ঞানী, বিজ্ঞ ও সিনিয়র হিসাবে অন্য দলগুলোও তাকে সামনে নিয়ে আগাতে চেয়েছিল। শুরুতেই ঘোষণা দিয়েছিলেন বিএনপির সঙ্গে তারা জোট বাঁধবে না, তবে বিএনপি যদি জামায়াতকে ত্যাগ করে আসতে পারে তবে ভাবতে পারেন। বিএনপি প্রশ্নে তিনি কৌশলে সরিয়ে দিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের একজন ড. বদরুদ্দোজার বিকল্প ধারাকে। সেখানেও তিনি রয়ে গেলেন কালিমামুক্ত। পরবর্তীতে নাম ধারণ করলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। শুরু হলো এখান থেকেই আসল \’খেলা\’। ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হলো বিএনপি। নির্বাচনে এবার বিএনপি আসবেই–এখানে কোনও ব্যতিক্রম চিন্তা করার তাদের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিন্তু জামায়াতকে ছেড়ে? তা কি হয়? নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এবং এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের নামে আর নির্বাচন করতে পারবে না। অথচ \’বিএনপির মায়ের পেটের ভাই যে জামায়াত\’। তাই ভাইকে ছেড়ে কেমন করে দেশে ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখতে পারে আরেক ভাই? শুরু হলো নতুন কৌশল।
ড. কামাল হয়ে গেলেন সেই পটভূমি তৈরির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিএনপি নিজে কখনোই জামায়াতকে হালাল করতে পারবে না এই বাংলার মাটিতে, অতীতেও পারেনি, সামনেও পারবে না। কী করা যায়? কার কাঁধে চাপা যায়? কে আছে এই মুহূর্তে যিনি হতে পারেন এই বৈতরণী পার হওয়ার হতো সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম? কষ্ট করতে হয়নি তাদের। হাতের কাছেই পেয়ে গেছেন সেই ব্যক্তিটিকে। মুক্তিযুদ্ধে ড. কামালের ভূমিকা যাই থাকুক না কেন, পরবর্তী সময়গুলোকে ভুলিয়ে না দিতে আবারও সামনে চলে এলেন বিএনপি-জামায়াতের রক্ষাকর্তা হিসাবে। আবারও প্রমাণ হলো বিএনপি এবং জামায়াত একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ড. কামাল বলেছিলেন এবং এখনও বলছেন তিনি বিএনপিকে সমর্থন দিচ্ছেন কিন্তু জামায়াত বা যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন দেন না। অথচ সম্প্রতি যখন নজরুল ইসলাম খান নির্লজ্জের মতো বলে দিলেন জামায়াতের মধ্যেও মুক্তিযোদ্ধা আছে। আশ্চর্যজনকভাবে ড. কামাল চুপচাপ আছেন। ধানের শীষের আশ্রয়ে নির্বাচনে নেমেছে চিহ্নিত ও সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের স্বজন ও সন্তানেরা। আর কতটা প্রকাশিত হলে বলবেন তিনি একজন প্রকৃত বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দলকে সমর্থন দিতে পারেন না। এমনকি যারা তাদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেবে তাদেরও তিনি ত্যাগ করতে দ্বিধা করেন না। না, আশা করলেও তিনি এমনটা করেননি এখনও। কেবল আবারও রহস্যজনকভাবে নিজেকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে নিয়েছেন।
\’মুক্তিযুদ্ধ\’ এবং \’মুক্তিযোদ্ধা\’ এগুলো কেবল দুটি শব্দ নয়, একটি দেশের ইতিহাস, যার সঙ্গে মিশে আছে স্বাধীনতার কথা। লাখো মানুষের রক্তমাখা গান আর রয়েছে লাখো মা ও বোনের ওপর অত্যাচারের কাহিনি। এসব ত্যাগের বিনিময়ে যে শব্দগুলো আমরা পেয়েছি তার দাম আমাদের কাছে অনেক বেশি। তাই বিএনপি যখন জায়েজ করার চেষ্টা করে যে জামায়াতেও মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে, তখন তাদের জন্য ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই মন থেকে আসে না।  এমন রাজনৈতিক শক্তিকে যারা আশ্রয় প্রশ্রয় দেয় তাদের জন্যও ঘৃণা। এদেশের মানুষ এমন ঘৃণ্য রাজনৈতিক শক্তিকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। রাজাকারদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে যে অপমান বিএনপি একবার করেছিল, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সেই একই অপমান আবারও করলো জামায়াতকে মুক্তিযোদ্ধাদের দল ঘোষণা দিয়ে। আগামী নির্বাচনে তাই রাজাকার আলবদরদের এই শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে সকল শক্তি দিয়ে।
এ বিষয়ে ড. কামালের বক্তব্য এখনও আমরা শুনতে পাইনি। আবারও সেই রহস্যজনক আচরণ তিনি করলেন।  তাহলে কি বলা যায় তিনি তার উদ্দেশ্যে সফল হয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করে দিয়েছেন? আমরা কি ধরে নেবো তিনি আসলে জামায়াতকে মাঠে রাখতেই নিজেকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে দিয়েছেন?