সাবিনা শারমিন : সভ্যতার অগ্রগতি ও পুরনো ধর্মীয় সামাজিক অনুশাসন- এই দুইয়ের পরস্পরবিরোধী মিথস্ক্রিয়ার অসহনীয় চাপের দায় মূলত পুরুষরাই কাঁধে নিয়েছে। আর যুগে যুগে নারীরা হয়েছে এই চাপ আর ক্ষোভের শিকার।
পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ ধর্মেই সংসারের অর্থনৈতিক দায়িত্বটি পুরুষ নিজের মাথায় চাপিয়ে নিয়েছে। নারীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে স্বাধীনতা এবং আত্মমর্যাদাবোধ। অর্থনৈতিক দায়িত্ব পুরুষকে দিয়ে পুরুষকে করা হয়েছে নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ।
বহুকালের লালন করা পুরুষের হাওয়া থেকে পাওয়া পুরনো শ্রেষ্ঠত্বের মিথ নারীর সৃষ্টিশীলতা আর আত্মনির্ভরশীলতার কাছে যখন মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন তাদের শ্রেষ্ঠত্বের অহং প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ধর্ম ও সমাজের দেয়া এই অবস্থান পুরুষের জন্য ক্রমেই এক যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে, যা পুরুষ এবং নারীর মধ্যে হাজার হাজার বছরের দেয়াল তৈরি করে রেখেছে।
এ দেয়াল মানুষ ভাঙতে পারছে না। কারণ এ দেয়াল অদৃশ্য এবং স্থায়ী। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে আজীবন সংসার করে গেলেও খুব সহজে কখনো বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারেনি। এ অদৃশ্য বিষাক্ত দেয়ালের নাম পুরুষতন্ত্র।
নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার লোভ পুরুষকে ’মানুষ’ হওয়া থেকে যোজন যোজন দূরে সরিয়ে রেখেছে। তাই অনেক পুরুষই একধরনের ফাঁপা ইগো সমস্যায় ভোগে। এ ইগো আমাদের ভাই, বাবা, স্বামী ও বন্ধুদের আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখেছে। কারণ আমাদের ভাই বন্ধুরা আপনজন হওয়ার চেয়ে পুরুষ হতে চায় অনেক বেশি।
কথাগুলো বলছিলাম ডাক্তার আকাশের আত্মহত্যা প্রসঙ্গে। ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ার,পুরুষরা যাই হোক না কেন পরিবেশ ও সংস্কার তাকে মিথ্যা অহং দিয়ে প্রতিবন্ধী করে দিয়েছে। তাই স্ত্রীকে একান্ত সম্পত্তি হিসেবে মনে করে আয়ত্তে আনতে না পারলে পুরুষ তা মেনে নিতে না পেরে চড়াও হয় নারীর উপর। সেটি পেরে না উঠলে হয়ে ওঠে আত্মঘাতী।
একজন উচ্চশিক্ষিত ডাক্তার কি শুধু স্ত্রীর পরকীয়ার কারণেই আত্মহত্যা করেছেন? নাকি এর পেছনে সহযোগী আরো অনেক কারণ ছিল? নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়ার ব্যর্থতা তার মনের গহীনে একধরনের মনোদৈহিক বিকারে পরিণত করে দিয়েছিল? যার করুণ পরিণতি সে হয়তো নিজেই নিজের জন্য ডেকে এনেছিল? এটি একজন ডাক্তার তথা একজন পুরুষের ব্যক্তিত্বের জন্য কি ব্যর্থতা নয়?
শুধু স্বামী হিসেবেই নয়, ডাক্তারি পেশার জন্যও এমন ব্যক্তিত্ব বড় ধরনের অপারগতা। ডাক্তার হয়েও নিজের পরিবারের একান্ত ব্যক্তিগত ইস্যুগুলো তিনি নিজেই সমাধান করতে পারলেন না। এতে মনে হচ্ছে মরে না গেলে একদিন তিনি অনেক বড় ডাক্তার হলেও রোগীরাও হয়তো তার কাছে নিরাপদ হতো না। নিজের জন্য হোক আর অন্যের জন্যেই হোক তিনি একজন আত্মখুনি।
মনে আছে রুমানার কথা? পরকীয়ার অভিযোগে তার স্বামী তার চোখ তুলে ফেলেছিল? ঘটনাতো অনেকটি সেরকমই মনে হচ্ছে। পার্থক্য হচ্ছে রুমানার স্বামী অভিযোগ এনে স্ত্রীর চোখ তুলে নিয়েছে আর ডাক্তার সাহেব ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে, স্ত্রীকে মেরে ফেলতে ব্যর্থ হয়ে ক্রোধে নিজেই নিজের জীবন নিয়ে নিয়েছেন। এটি কি নির্ঘাত অপারগতার যন্ত্রণা নয়? যখন একটি ধ্বংসাত্মক পরিণতি ঘটানো অপারগের জন্য একান্তভাবেই অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল?
আসলে বিষয়টি শুধুই নারী আর পুরুষের? আমরা কি কাদা ছোড়াছুড়ি না করে এর অন্তর্নিহিত কারণ খুঁজে নিয়ে সমাধানের পথে হাঁটতে পারিনা, যেনো এমন পরিস্থিতি আর না হয়? আকাশ আর মিতুর পরিবার তাদের পরিবারের সমস্যা কেনো সমাধান করতে পারলেন না?
আকাশ কি পরিবারের সিনিয়র সদস্যদের সাহায্য চেয়েছিলেন? তিনি কি তার নিজের পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়টি আত্মীয় স্বজন নিয়ে একটি সমাধানে আসতে পারতেন না? তাহলে তারা হয়তো অন্তত বোঝাতে পারতেন সমস্যাটি কোথায়।
সে যা হোক,আকাশ আর মিতুর পাশে একজন মানসিক চিকিৎসকেরও প্রয়োজন ছিল। যিনি উভয়কেই কাউন্সেলিং এর মধ্যমে সমাধান দিতে পারতেন। জীবন যখন রয়েছে,তখন সমস্যা আর অসুস্থতাও থাকবে। আর অবশ্যই এর একটি ইতিবাচক সমাধানও থাকবে।
তার অর্থ এই নয় যে কারো স্ত্রী গোপনে অনৈতিক সম্পর্ক মেইন্টেইন করলে তা অন্যায় নয়। স্বামী হোক আর স্ত্রীই হোক বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন না করে অন্যত্র সম্পর্ক স্থাপন করা অবশ্যই নৈতিকভাবে অন্যায়। যদি তা সত্যিই তা হয়। এ সমস্যা থেকে আমাদের সকলকে বাঁচাতে হবে।
আচ্ছা মিতুর জায়গায় আমাদের দেশের বহুগামী একজন সেলিব্রেটি পুরুষকে বসিয়ে দেখুন, যার অনেকগুলো বড় বড় সন্তান রেখেও মেয়ের বয়সী একজন নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তার স্ত্রী কি সুইসাইড করেছিলেন?
নাহ! করেন নাই। যেহেতু তার স্ত্রীর আত্মনিয়ন্ত্রণ করার ক্যাপাসিটি রয়েছে,তাই তিনি খুব ভালোভাবেই সন্তানদের নিয়ে জীবন-যাপন করছেন। এরকম অভিযোগ আমাদের প্রাক্তন একজন কবি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও রয়েছে। তার কোন স্ত্রী তো সুইসাইড করেন নাই।
বহুগামিতার সমস্যা নিয়ে ট্রাম্পকে দেশের জনগণই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। সকল জায়গাতেই পুরুষের বহুগামিতা সমাজে মেনে নেয়ার ট্রেন্ড রয়েছে যা নারীর ক্ষেত্রে নয়। এমনকি নারী হয়ে নারীরাও তা মানেন না। নারীরা যদি পুরুষের এই অনৈতিক আচরণ মেনে নিয়ে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে, তবে পুরুষ কেনো সুইসাইড করবে?
আমার কাছে মনে হচ্ছে এই আত্মহত্যায় নারী বা পুরুষের একাধিক সম্পর্ক বিষয়টি যতোটানা গুরুত্ব বহন করে,তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে মানসিক চিকিৎসার বিষয়টি। এমনও হতে পারে এর আগে তিনি ডাক্তার না হতে পেরেও আত্মহত্যা ঘটিয়ে ফেলতেন, যা হয়তো স্ত্রীর পরকীয়ার ক্ষেত্রে ঘটিয়েছেন। কিছুদিন আগে শিক্ষক না হতে পেরে একজন মেধাবী ছাত্র অপমানে আত্মহত্যা করেছেন।
কথা হচ্ছে মানসিকভাবে স্পর্শকাতর এই মানুষগুলোর নিয়ন্ত্রণহীন রাগের বিষয়ে আত্মীয় স্বজন অনেকেই জানলেও এর প্রতিকারের কোন উদ্যোগ হয়তো গ্রহণ করেন না। তারা হয়তো ভাবেন মানসিক চিকিৎসার বিষয়টি সমাজ ভালোভাবে গ্রহণ করবে না। বিষয়টি লজ্জার। এতে সামাজিক সম্মান নষ্ট হবে। তাই তারা অতি সন্তর্পণে এটি এড়িয়ে যান।
আকাশ তার ফেসবুকে মিতুকে নিয়ে তার ভালোবাসার কথা লিখেছে। যা দেখে মনে পড়ে গেল সেই মানসিক বিকারগ্রস্ত ছেলেটির কথা। যে ছেলেটি একজন ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি করাতে না পেয়ে একের পর এক চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছিল।
আহারে! প্রকৃত ভালোবাসা কি কারো ঘাড়ে বন্দুকের নল রেখে চরিত্রহীনতার স্বীকারোক্তি নেয়? প্রকৃত ভালোবাসা কি রক্তাক্ত করে কথা আদায় করে ভিডিও পাবলিক করার নাম? এতে কি এই প্রমাণিত হয় না যে আঙুর ফল টক?
নিজের দখলে পাচ্ছেন না বলে মরে গিয়েও প্রতিশোধই নিলেন? নৈতিকতার দিক থেকে আমাদের জনৈক সুন্দরী মডেলের প্রেমিক রাজীব এবং ডাক্তার আকাশের মধ্যে পার্থক্যটি কোথায় থাকলো?
এমন বিধ্বংসী মানুষ নিজেকে খুন করতে পারলে হয়তো স্ত্রীকেও খুন করতে পারতেন। পরিস্থিতি হয়তো প্রতিকূলে যাওয়াতে তিনি নিজেই সেটি করে বসেছেন। অসুস্থতা এমন পর্যায়ে গিয়েছে যেখানে নিজের জীবন দিয়ে হলেও স্ত্রীকে তিনি কোনভাবেই অন্য কারো হতে দিতে চান নাই। আসলে স্ত্রীর চরিত্র হনন করে তিনি কি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারেননি যে তিনি অপারগ?
এ থেকে মুক্তি পেতে হ’লে সংস্কার করতে হবে অনেক কিছুই। নতুবা এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি অচিরেই আরো ঘটবে। চলুন আমাদের পরিবারের মানসিকভাবে অসুস্থ্য মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের পরিবার গুলোকে বাঁচাই। আর দেনমোহরের চাপ থেকেও আমাদের ভাইগুলোকেও নিস্তার দেই।
লেখক : কলামিস্ট।
This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.