অবশেষে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ফায়ারম্যান সোহেল রানা। বনানী এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য পাগলটা নিজের জীবনটাই দিয়ে গেল।
নিজের জীবন দিয়ে সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল স্বার্থপরতার নাম জীবন নয়, পরের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার নামই জীবন।
এই স্বার্থপর পৃথিবীতে আবারও প্রমাণ করে দিল আমরা ’জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়’। এ জন্যই সোহেল রানারা কখনও মরে না। এরা বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ। মানুষের হৃদয়ে, মানুষের অন্তরে।
বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আটকেপড়া মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে ফায়ারম্যান সোহেল রানা গুরুতর আহত হন।
দেশের সব মানুষের শুধু একটাই চাওয়া ছিল- যেন সোহেল সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসে। রাষ্ট্র থেকেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল।
চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছিল দেশের বাইরে৷ কিন্তু ওপরওয়ালা সোহেলের গল্পটা হয়তো অন্যভাবেই লিখতে চেয়েছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।
সৃষ্টি করে যান অমরত্বের এক নতুন ইতিহাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোহেলের জন্য মানুষের হাহাকার দেখলে মনে হয় সোহেলের এই আত্মদান বৃথা যায়নি।
সোহেল এ দেশের মাটিতে অমর হয়ে থাকবে আজীবন। সোহেলের ছবিগুলো যখন টাইমলাইনে ঘুরে বেড়ায় তখন মন থেকে শুধু একটাই দোয়া উঠে আসে- ’প্রিয় সোহেল, ভালো থাকবেন ওপারে’।
সারা দেশের মানুষ যখন সোহেলের শোকে কাতর, ঠিক তখনই আরেকটি সংবাদে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজউদ্দোলা এক আলিম পরীক্ষার্থী মেয়েকে প্রশ্নপত্র দেয়ার লোভ দেখিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করে।
এ ঘটনায় মেয়েটি তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সেদিনই থানায় মামলা করেন। তার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মাদ্রাসার ছাদে প্রকাশ্য দিবালোকে মেয়েটির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
এতে তার শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যায়৷ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানতে হয় তাকে।
রাষ্ট্র থেকে মেয়েটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর কথা ছিল; কিন্তু মেয়েটির অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে তাকে সেখানে পাঠানো সম্ভব হয়নি।
একজন মাদ্রাসার শিক্ষক থেকে এ ধরনের লজ্জাজনক ঘটনা কখনও আশা করা যায় না।
এর সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও প্রমাণ হয়, আমার যে বন্ধুরা নারীদের ধর্ষণ, নির্যাতনের জন্য একতরফাভাবে শুধু নারীদের পোশাককে দায়ী করে যান, এ ঘটনা নিঃসন্দেহে তাদের জন্য একটি বড় চপেটাঘাত।
যদি তাই হতো, তবে বোরকা পরিধান করা বোনটির আজকে এ অবস্থা হতো না। আসলে নারী নির্যাতনকারী অমানুষদের কোনো ধর্ম নেই, বর্ণ নেই। তাদের শুধু একটিই পরিচয়- তারা অমানুষ।
নিজেদের বিকৃত রুচির জন্য এরা যা ইচ্ছে করতে পারে। আমাদের এ ধরনের মানুষের বিরুদ্ধে আরও অনেক বেশি সোচ্চার হওয়া উচিত।
আমি আশা করছি, এ ধরনের মানুষরূপী অমানুষগুলোকে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে, যাতে আর কেউ এ ধরনের কাজ করার মতো সাহস না পায়।
জানি না আদৌ এসব মানুষের কোনো বিচার হবে কিনা। নাকি প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় কিছু দিন পরই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবে তারা।
বনানী আর ফেনীর আগুনে আমাদের সবার মনকেই বেশ পোড়াচ্ছে৷ তবে আগুন আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে গেল।
সোহেল রানার ঘটনা আমাদের যেমন গর্বিত করেছে, একই সঙ্গে ফেনীর ঘটনা আমাদের দিয়েছে লজ্জা। ঠিক যেন ’যে আগুনে অমর, সে আগুনেই লজ্জা’
সূত্র: যুগান্তর