বউয়ের কথা শুনা পুরুষটাও জনসমক্ষে দাবি করে আমি বউয়ের কথা শুনিনা, বউয়ের কথা না শুনা পুরুষটাও দাবি করে আমি বউয়ের কথা শুনিনা। বউয়ের কথা শুনা অথবা না শুনা ব্যাপারটা যে পুরুষদের জন্য বিশাল একটা প্রেস্টিজিয়াস ইস্যু সেটা পুরুষের এই লুকোচুরি দেখেই বুঝা যায়। প্রশ্ন হলো বউয়ের কথা না শুনলে সংসার টিকে কিভাবে অথবা বউকে শাসিয়ে রাখাই কি পুরুষের ধর্ম?
দুই শ্রেণীর পুরুষের সংসারে অশান্তি ছায়ার মতো লেগে থাকে। এক, যে পুরুষ বউয়ের সব কথা শেষ কথা বলে মানে। দুই, যে পুরুষ বউয়ের সব কথাকে বাজে কথা বলে মানে। বউয়ের সব শুনা পুরুষেরা বউয়ের আদরের লালটু সোনা হলেও নিজ পরিবারে ভিলেন হয়ে যায়। কেননা, খুব কম মেয়ের পক্ষেই সামগ্রিকভাবে ব্যালেন্স রাখার ক্ষমতা আছে। অধিকাংশই চায় আপন স্বার্থ বুঝে নিতে। অধিক ভাইবোন দূর থাক একমাত্র সন্তানের বউ হয়েও সে টার্গেটে থাকে কতোক্ষণে শ্বশুর শাশুড়ির জমি নিজের বরের নামে হবে? আত্মীয়দের ব্যাপারে হিসাব করে, বাপের বাড়ির নাকি শ্বশুরবাড়ির।
পরশ্রীকাতরতা, তুলনা, হিংসা এই বিষয়গুলো প্রত্যেকটা নারীর থাকলেও এসব নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সকল নারীর মাঝে নেই। সেক্ষেত্রে বউয়ের সকল কথা শুনা পুরুষটা বউয়ের সামনে নাদুসনুদুস হলেও বন্ধু মহলে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল দিয়ে বউয়ের অন্যায় আচরণ নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলেও ভাবটা এমন নেয় যে, সে বউকে আজ বলেনি সুযোগ দিলো, কাল ঠিকই বলবে। অথবা বউয়ের কথা শুনিনা। খোঁজ নিলে দেখা যায় পরিবারে নানাবিধ অসন্তুষ্টির সৃষ্টি ছেলে বউয়ের সুরে সুর মিলায় বলে। আমি এমনও দেখেছি, বউয়ের কথা শুনিনা বলা পুরুষটা মাস শেষ বউয়ের নামে ডিপোজিট রাখছে।
গত বছর এই লুকোচুরি স্বভাবের এক পুরুষের আকষ্মিক মৃত্যুর পর জানা গেলো তিনি তার সকল সম্পত্তি বউয়ের নামে করে রেখেছেন বহু বছর আগেই। সেই খবর শুনে অন্য পুরুষরা চল্লিশ বছর বয়সী নারীকে বিয়েতে করতে মরিয়া হয়ে গেলো, অথচ আমাদের সমাজেরি প্রচলিত ডায়লগ, "নারী কুড়িতে বুড়ি"। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বউয়ের কথা শুনা পুরুষরা নিজ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আবার বউয়ের কথা না শুনা ছেলেদের বউরা ভীষণভাবে ভুক্তভোগী হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই নারীদের জন্য শ্বশুরবাড়ি অনুকূলে থাকে না। শত চেষ্টা করেও শ্বশুরবাড়ির মন যোগানো সম্ভব হয় না। তবে কোন মেয়েই যে শ্বশুরবাড়িতে সুখি নয় এমনটা ভাবা যাবে না। অনেকেই সুখী। আমি বলছি অশান্তিপূর্ণ পরিবেশের কথা। এখন যেই মেয়ের স্বামী তার কোন কথাই আমলে নেয় না সেই মেয়ে থাকে বিপদে। সে তার শ্বশুরবাড়ির লোকদের অন্যায়গুলো প্রতিবাদ করার জন্য সুযোগ পায় না। অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদ করলেও বরের ধমকে, চোখ রাঙানিতে তার অপমান যায় বেড়ে। বরের এমন আচরণ দেখে অন্যায়কারী সদস্যগুলো আরও প্রশ্রয় পায়, তারা আরও মরিয়া হয়ে উঠে বউকে অপমান করার জন্য। কিছু কিছু পুরুষ আছে যারা অন্ধ ভক্ত।
ভাইবোন, বাবা মা তাদের কারও না কারও উপর তার অগাধ বিশ্বাস। দুনিয়া উলটে যাবে কিন্তু তার সেই বিশ্বস্ত মানুষ খারাপ কিছু করনেনা এটাই তার বিশ্বাস। বউটা যখন সংসারে আসে, তখন সে নিরপেক্ষভাবে সকলের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে পারে, কারণ এক্ষেত্রে তার পূর্ব পরিচিত নেই, জন্ম থেকে একসাথে বড় হওয়ার স্মৃতি নেই, যুগ যুগ ধরে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ নেই। সে যখন সংসারে যায় তখন সবাই তার কাছে নতুন। দিন যায়, মাস যায় বউটস বুঝতে শিখে যায় কে কোন দিকে হাটে, কেন হাটে? এমন পরিস্থিতিতে অন্ধ ভক্ত জামাইকে নিয়ে সে থাকে বিপদে। ভাইবোন সম্পর্কের মাঝেও হিংসা, রেষারেষি থাকে সেটা আমরা অস্বীকার করতে পারবো না। তো প্রতিনিয়ত বউটা বরের ঠকে যাওয়া দেখে একদিকে কষ্ট পায়, অপরদিকে শ্বশুরবাড়ির লোকের করা অপমান সাথে বরের কাছে ন্যায্য বিচার না পাওয়া এই সব মিলিয়ে সেই বউয়ের মন উঠে বিষিয়ে।
তখন স্বামীকেও আর ভালো লাগে না। সংসার ছেড়ে পালিয়ে যেতে চায়। অনেক সময় চলেও যায় নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে। সংসার করা মানেতো নিজেকে নিঃশেষ করা নয়, সংসার মানে বোঝাপড়া, মতামত, আলোচনা, সমালোচনা দিয়ে একাকী নিঃসঙ্গ জীবনটা সাজিয়ে নেয়া। বউকে শাসিয়ে রাখা পুরুষটার একটা সময় সবই থাকে শুধু বউটাই থাকে না। দিন শেষে আমরা প্রত্যেকেই তুমি হীনতায় ভুগি। সেই পুরুষটা তুমি মানুষটা পেয়েও হারিয়ে ফেলে এই হতাশাতেই একটা সময় নিঃশেষ হয়ে যায়।
বউয়ের কথা শুনিনা এটা যেমন গর্বের বিষয় না তেমনি বউয়ের কথা ছাড়া চলি না এটাও ভালো কিছু নয়। যে নদীতে বাঁক না থাকে সেই নদীতে ঘুরার আনন্দ নেই। সোজা রাস্তা দেখতে যতো সুন্দর লাগে ক্রস রাস্তা তার চাইতেও বেশি সুন্দর, দেখলে মনে হয় ডিজাইন করা। বউকে গুরুত্ব দিতে হবে, বউয়ের ন্যায় অন্যায় দাবি মেনে সম্মতি অসম্মতি করার মতো বুদ্ধি থাকতে হবে। বউয়ের কথা শুনে যেমন অন্যকে ঠকানো যাবেনা, ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়া যাবে না, বাবা মাকে ত্যাগ করা যাবেনা, তেমনি বউকে অন্যের হাতে অপমান করার সুযোগও দেয়া যাবে না, হোক অপমানকারি আপনার গর্ভধারিণী মা।
মুরুব্বিদের আমরা সম্মান করতে পছন্দ করি, তাদের থেকে বাঁকা ব্যবহার কাম্য নয়। কোনভাবেই বলা যাবে না, "থাক, মা বলছে।" মনে রাখবেন, আপনার মা আপনার জান্নাত হতে পারে কিন্তু তিনি সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। তাঁর আদালতে তিনি বিচারের ঊর্ধ্বে নন। তাই আপনার জান্নাতকে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট জান্নাতে সোপর্দ করার জন্য তার ভুলত্রুটি শুধরে দেয়া আপনার দায়িত্ব। সন্তান জন্ম দিলেই যেমন মা হওয়া যায় না, তেমনি কেবল পিতা মাতার ভরণপোষণ, সখ আহ্লাদ পূরণ করে দিলেই আদর্শ সন্তান হওয়া যায় না।
বউকে ভালো বাসতে হবে। আপনার বাড়িতে আপনার বউয়ের অবস্থান কেমন হবে সেটা অনেকটাই আপনার উপর নির্ভর করে। অন্যায় মেনে নেয়া মানে প্রতিনিয়ত অন্যায় করতে দেয়ার সুযোগ দেয়া নয়। অন্যায় মেনে নেয়া মানে আগামীতে তোমাকে ভালো কিছু করতে দেয়ার সুযোগ দেয়া। বউয়ের কথা না শুনা পুরুষত্বের চাইতে বউকে সম্মান দেয়া পুরুষত্ব অধিক সম্মানের।
Romana Akter - শুদ্ধবালিকা