রাজবাড়ীর পাংশায় প্রায় ২৫০ মণ গুড় ধ্বংস করা হয়েছে! আহা মানুষের কি শখ, এই রমজানে আখের গুড় দিয়ে শরবত খেতে চায়! এই গুড়ে থাকে কাপড়ের রং, চক, ফিটকিরি ও চিনি। কত দারুণ সংবাদ আমাদের জন্য! একের ভেতরে চার!
অন্যদিকে বছরজুড়ে খেজুরের যে চাহিদা থাকে তার ৭০ ভাগ প্রয়োজন হয় পবিত্র রমজান মাসে! হিসেব করে দেখা গেছে, চাহিদার পরিমাণ খেজুর এই বছরে আমদানিই করা হয়নি! খাচ্ছি তাহলে কী? কয়েক বছরের পুরনো, পঁচা খেজুরকে চকচকে করে পুনরায় মোড়কে ভরে বাজারজাত করা হচ্ছে! সাম্প্রতিক নেওয়া কিছু জোরালো পদক্ষেপের কারণে এখন বাজারে প্রায় ৬০ ভাগ খেজুর যথাযথ ও খাবার উপযোগী বলে জানা গেছে।

আবার ভৈরবে ১ কেজি দুধ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭৫০ গ্রাম পানিঃ২৫০ গ্রাম দুধ এই হিসেবে!
গত দুইদিন আগে প্রকাশিত খবরে জানা গেলো বাজারে যে প্যাকেটজাত তরল দুধ আমরা খাচ্ছি, তার ৯৬ টি নমুনার মধ্যে ৯৩ টিতে মানবদেহে ক্ষতিসাধনকারী উপাদান অধিক মাত্রায় পাওয়া গেছে! সীসা, এ্যান্টিবায়েটিক অনুজীব, টেট্রাসাইক্লিন এসবের মধ্যে অন্যতম।

মাত্র কিছুদিন আগে প্রায় ৫২ টি পণ্য বিষাক্ত উপাদান থাকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে যার মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির লবণ, তেল ও মশলা উল্লেখযোগ্য!

আপনি বাজার থেকে জ্যুস কিনে খাবেন, জেনে রাখুন সেখানে ফলের কোনো অস্তিত্বই নেই। কখনো আমের জ্যুসে আমের বদলে থাকে পঁচা কুমড়া কখনোবা তাও নয়, থাকে শুধু ফ্লেভার। আহা ফ্লেভারযুক্ত জ্যুস খেয়ে আপনার, আমার প্রাণ হয়ে যায় ঠান্ডা...

আপনি মুড়ি খাবেন তাতে আছে ইউরিয়া ও হাইড্রোজ, সবুজ সবজি ও লেবুতে মেশানো হয় কাপড়ের রং! যে ফার্মের মুরগি এত খুশি হয়ে খাচ্ছেন, সাথে নিজের বাচ্চার মুখে তুলে দিচ্ছেন চিকেন পিস, আহা আপনার, আমার বাচ্চা হবে স্বাস্থ্যবান! জেনে রাখুন নৈতিক কতিপয় ব্যবসায়ীগণ সেই বিশেষ মুরগিকে সুগঠিত করছেন বিষাক্ত লেড ও ক্রোমিয়ামের মাধ্যমে, যা মানব শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শুধু তাই নয় মাছে আছে ফরমালিন এবং আরও বিষাক্ত উপাদান। এখন আবার চালেও নাকি সীসা ও বিষাক্ত ক্রোমিয়াম পাওয়া যাচ্ছে! অনেকে পছন্দ করে লাল চাল খাওয়া শুরু করেছিলেন, আহা কত সুখ! সেই লাল চালের লাল আভা আসে মূলত লাল রং থেকে। অন্যান্য ফলমূলে যে পরিমাণ সংরক্ষণ করার উপাদান ব্যবহৃত হয়, ধরে নিতে পারেন সেখানেও পরিমাণের চেয়ে অধিকতর ক্ষতিকারক উপাদান ব্যবহৃত হচ্ছে।

সবচেয়ে মজার এবং একইসাথে আতংকের বিষয় হচ্ছে গাছ থেকে যে ফল সংগ্রহ করা হয় তা বাজারে আসা পর্যন্ত ০৫ বার রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহৃত হয়ে আসে। আহা! জীবন... আমাদের কত ভালবাসার জীবন! কিভাবে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে কতগুলো নরাধম মিলে!

আমি আসলে সম্মিলিত প্রয়াসেও এর সমাধান খুঁজে পাইনা! ব্যক্তি চরিত্রের এত এত নোংরামী, এত দ্বিচারিতার সমাধাণ রাষ্ট্রই বা কিভাবে দেবে? অনেক আশাবাদী মানুষ আমি, কিন্তু কিভাবে সম্ভব এই সমস্যা নিরসন! আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে বুক, পিঠ না থাকা ওই পাষন্ডদের কাছ থেকে, এরা নিজেরাও কি ওসব খায়? এদের নিজেদের সন্তানেরাও কি একই ক্যামিকেলযুক্ত খাবারই খাচ্ছে?

একটু খেয়াল করে দেখবেন, আগে আমরা ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত রোগী পেতাম হাতেগোনা! এখন খুব বেশি দূরে নয়, মিরপুরের ডেলটা হাসপাতাল অথবা ইন্ডিয়াতে আমাদের কি পরিমাণ এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন! নাহ্ না, আকাশ থেকে উড়ে আসছেনা, এসব ওই পাষন্ড, বর্বর, অর্থলোভী ক্ষুদ্র,মধ্য ও বৃহৎ ব্যবসায়ীদের ক্যারিশমা!
ওরা ভুলে গেছে প্রকৃতির একটা নিজস্ব জবাব রয়েছে। যা করবে তার প্রতিদান যে তাদের কাছেও ফিরে আসবে সেটি ওরা ভুলেই বসে থাকবে!

আমি আসলেই করণীয় জানিনা! একটা কিছু যা করা যেতে পারে তা হলো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিজেরাই অংশগ্রহণ করা। তাতেও খুব লাভ হবে কিনা জানিনা, কারণ আজকাল বীজও মডিফায়েড থাকে! তারপরেও নিজের খোলা আঙিনায়, বাসার বারান্দায় অথবা ছাদে সবুজে ভরে ফেলতে পারেন! এতে পরিবেশের উপকার হবে একইসাথে নিজের পরিবারও ক্যামিকেলমুক্ত সবজির যোগান পাবে। এটিও আসলে চূড়ান্ত সমাধান নয়!

শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন ও তাঁর প্রয়োগে এর চূড়ান্ত সমাধাণ আসবে না! দরকার সচেতনতা! এত এত ভন্ডের মুখোশের আড়ালে কে দেবে পূর্ণ আশ্বাস! যিনি শপথ করবেন তিনি যে সে শপথ ভাঙবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায়!? এটার সমাধান হয়তো একসময় আসবে, তখন বলা যাবে এইভাবে আমরা এর সমাধান করেছি! এখন আসলে সত্যিই জানা নেই আমাদের মত এত অস্বচ্ছ, নৈতিক অবক্ষয়ে আক্রান্ত মানুষের দেশে, আমাদের প্রথম মৌলিক চাহিদা অন্নের নিরাপত্তা কিভাবে আসবে!?

শেষকথাটুকু বলতে চাই, আমাদের বিদ্যমান আইনে হত্যাকান্ডের শাস্তি যদি ফাঁসি অথবা যাবজ্জীবন হয়, তবে আমাদের তিলে তিলে মেরে ফেলবার এই দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান পাপের শাস্তি এখন যথাযথ মাত্রায় নির্ধারণ করার সময় এসেছে! বিশেষ ব্যবস্থায় তথাকথিত নরাধমদের শাস্তির আওতায় আনার উপযুক্ত সময় এখুনি, নয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমাদের একজন রবীন্দ্রনাথ আসবেননা, পাবোনা একজন নজরুলও, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম পাবেনা একজন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকেও, হতাশা নিয়েই বলতে হয় বিভিন্ন পেশার প্রখ্যাত মানুষদেরও আমরা পাবোনা! আমরা বরং পাবো একটি বিকলাঙ্গ সমাজের ধুঁকে ধুঁকে মারা পড়ে যাওয়া কিছু মানুষ...

দয়া করে রাষ্ট্রের উপরে দায় চাপিয়ে নিশ্চিন্তে থেকেন না। আপনার, আমার ব্যক্তি চরিত্রের অধঃপতন শুধু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র ও সরকার নয়, অন্য কোনো প্রথম বিশ্বের সরকারও পরিবর্তন করতে পারবে না!
সাধারণেরা ভাবুন, তথাকথিত অনৈতিক ব্যবসায়ীরাও ভাবুন আগামী প্রজন্মকে আপনারা কী এরকম একটি বিকলাঙ্গ সমাজই উপহার দেবেন?

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

লেখক: অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন), ওয়ারী।


বিডি প্রতিদিন