বাংলাদেশ একটি ছোট ঘনবসতি পূর্ন দেশ। এ দেশে সমস্যার শেষ নেই। তার মধ্যে সবথেকে বড় সমস্যা হচ্ছে বেকার সমস্যা। এ দেশে শিক্ষিত অশিক্ষিত অনেক বেকার রয়েছে। যারা ঠিক মত খেতে পারে না দু’বেলা। যাদের কাছে জীবন মানেই একটি সংগ্রাম। দুমুঠো খাবার যোগাড় করতে যাদের দৌড়াতে হয় বাড়ি বাড়ি টিউশন করতে। এরকমই একজন যুবক তন্ময় আকমগীর। যিনি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন কিছু কথা। পাঠকদের উদ্দশ্যে তা তুলে ধরা হলো:-
যাচ্ছি বন্ধুর বাসায় দাওয়াত খেতে ধানমণ্ডি ২৭। পরনের পোশাকে বড়লোকির ভান ধরা চটকদার বিজ্ঞাপন। জিন্সের প্যান্টের সঙ্গে খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি। দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই যে ৩০ টাকা বাঁচানোর জন্য সকালের নাশতা খাইনি।

লেকের পাড় দিয়ে হাঁটছি। দূরে তাকিয়ে দেখি, কলেজপড়ুয়া কয়েকটি ছেলে সিগারেট টানছে। এটা অবাক হওয়ার মতো ঘটনা না। এখানে এর চেয়েও বেশি কিছু ঘটে। আচ্ছা, ঘটে বলেই কি আমরা মেনে নিই? প্রতিবাদ করার এতটুকু দায়বদ্ধতা কাজ করে না? আমার ইচ্ছা করছে সদ্য কলেজে ওঠা ছেলে কয়টাকে থাপড়িয়ে সিগারেট খাওয়ার স্বাদ ভুলিয়ে দিই। কিন্তু অচেনা শহর। পাল্টা আক্রমণের সময় কেউ পাশে থাকবে না। দেখেও না দেখার ভান করে খানিকটা আনমনা হলাম। ছেলে দুটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেলাম, ’দূর, এ জীবন আর ভালো লাগে না। বাপমরা একটা ছেলে খামচিয়ে কতটুকু আর এগোতে পারে? তার ওপর বোনের বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব। উফ! আরেকটা সিগারেট ধরা তো।’ তাতেও খুব একটা অবাক হইনি। সবারই কষ্ট থাকে, আছেও। তাই বলে সিগারেট খেতে হবে? থাপড়ানোর পরিবর্তে ছেলে দুটিকে এখন বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা হলো। যেন বলি—আমারও তো কষ্ট রাখার জায়গা নেই!

বন্ধুর বাসায় এসে বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম। আমার সঙ্গে আর তিনজন বন্ধু। দাওয়াতের উপলক্ষ হলো, বন্ধু মেহেদি নতুন দামি একটা বাইক কিনেছে। বাইরে ট্রিট দেওয়ার কথা থাকলেও আন্টির আবদার—নিজ হাতে রান্না করে আমাদের খাওয়াবেন। গোছানো বাসা। মনোরম পরিবেশ; কিন্তু ভেতরে গিয়ে টের পেলাম উত্তাপ। বন্ধুর বাবা আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলছেন, ’ছোটবেলায় মা-বাপ হারানো এই আমি অনেক কষ্টে এসব জোগাড় করেছি অযথা নষ্ট করার জন্য? তা ছাড়া বাইক অ্যাকসিডেন্ট খুব মারাত্মক।’

দুঃখ প্রকাশ করে বন্ধু বাইরে ট্রিট দেওয়ার কথা বলল। আমরা ওকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে বাসায় রেখে এলাম। বাকি বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটতে লাগলাম ফুটপাত ধরে। যেকোনো ঘটনার রেশ আমার মাথায় অনেকক্ষণ ঘুরপাক করতে থাকে। এখনো করছে। সে জন্য মাথায় টনটনে ব্যথা। এক কাপ কড়া লিকারের চা খেলে ঠিক হয়ে যেত; কিন্তু পেটে ক্ষুধা। আগে কিছু খেয়ে নিতে হবে।

আমার বন্ধুভাগ্য খুব ভালো। দৈন্যদশায় হাবুডুবু খেলেও আমার বন্ধুরা সব টাকার জাহাজ। তাদের সঙ্গে অবশ্য টাকার জন্য বন্ধুত্ব হয়নি; টাকাওয়ালা সোসাইটির ব্যাপারে আমার সম্যক ধারণা দরকার। টুকটাক লেখালেখি করি। সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে জানা লেখকের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

তবে আমার ভাগ্য আরেকটু সুপ্রসন্ন যে আরিয়া নামে টাকাওয়ালা একটা প্রেমিকা জুটেছে কপালে। আমি বলতে অজ্ঞান, দুই চোখে আমাকে ছাড়া কিচ্ছু দেখে না। ওর কথা ভাবতে গেলেই শরত্চন্দ্রের নায়িকা, কালবেলার মাধবীলতা কিংবা হুমায়ূন আহমেদের বাকের ভাইয়ের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মুনার কথা মনে পড়ে। পার্থক্য হলো, আমার প্রেমিকা ওদের চেয়েও বেশি ভালোবাসে আমায়।

ফোনে জিজ্ঞেস করল, ’কোথায় আছ?’ আমি বড়লোক প্রেমিকের মতো করে উত্তর দিলাম—’ধানমণ্ডি সাতাশের ইউনিক রেস্টুরেন্ট ইউনিমার্টে।’ উত্তর দিয়ে কামড় বসালাম তৃতীয় শিঙাড়াটায়। ইউল্যাবের সামনের এই দোকানটায় ভালো মানের শিঙাড়া বানায়। ভেতরে বসার মতো জায়গা নেই। অন্যদের মতো আমিও প্লেট হাতে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খাচ্ছি।

আশপাশে আরিয়া আছে কি না কে জানে। থাকলে থাকতেও পারে। সুপারম্যানের মতো হঠাত্ উদয় হয়। শিঙাড়ার বিল মিটিয়ে পেছনে ঘুরতেই দেখি আরিয়া। হাতে কোক। আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, ’তোমাদের বেশি দামি ইউনিমার্টে নিশ্চয়ই কম দামি এই জিনিসটা নেই। তাই নিয়ে এলাম।’


প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের তন্ময় আলমগীরের মত এমন লক্ষ লক্ষ বেকার যুবককরা। যারা হয়তো নিজেদের কথা এভাবে জানাতে পারে না। থেকে যায় আড়ালেই।অনেকেই পড়া-শুনা শেষ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন চাকরীর জন্য দ্বাড়ে দ্বাড়ে। কিন্তু তাদের ভাগ্যের সিকে কবে ছিড়বে তা জানে না কেউ।