ডেস্ক- গত ৩০ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে ছাত্রলীগের বেধরক মারধরের শিকার হন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র নূরুল হক নূর।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে ধানমণ্ডির আনোয়ার খাঁন মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
কিন্তু দুই দিনের মাথায় তাকে ওই হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগ উঠে। এরপর তাকে অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতাল ভর্তি করা হয়। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার কারণে সেই হাসপাতালের নামও বলতে চাইছেন না স্বজনরা।
এক সপ্তাহ পর ৭ জুলাই নুরের ভাবির সঙ্গে কথা হয় এক অনলাইন নিউজ পোর্টালের। এসময় নুরুল ইসলাম নুরের নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি।
তিনি বলেন, নূর মাকে হারিয়েছেন যখন তার বয়স আড়াই। এরপর বাবাই বড় করেছেন। কিন্তু ছেলের এত সমস্যা তাকে জানানো হয়নি। তিনি (নুরের বাবা) জানেন না, শরীর এতো খারাপ। সে দেখতে আসতে চায়। কিন্তু আমরা বলেছি নূর ভালো আছে।’
’শুরুর দিকে নূরের শরীরের এতো খারাপ দেখা যায়নি। যেগুলো এখন দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে বলতে পারেন ভীষণ অর্থ সংকটে ভুগছি। আমরা খুবই খারাপ অবস্থায় আছি। না পারছি রোগীকে দূরে সরিয়ে দিতে, না পারছি ভিটেমাটি রক্ষা করতে।’
নূরের ভাবি বলেন, ’ও যে ওয়াশ রুমে যাবে সেখানেও দুই জন মিলে নিয়ে যাওয়া লাগছে। ডান হাতের কাঁধে আঘাত পেয়েছে। এতে প্রচণ্ড ব্যথা, হাত নাড়াতে পারছেন না তিনি। মেরুদণ্ডতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। একটানা বেশিক্ষণ বসে থাকলে ব্যাথা হয়।’ ’কিডনি সমস্যার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসক। একটি পরীক্ষার ফল পেলেই এটা নিয়ে বুঝা যাবে।’
"কিছুক্ষণ পর পর নিজেই নিজের চুলগুলো ধরে টানে। আর বিড়বিড় করে বলে, ’আমার মাথা, আমার মাথা’। বিড়বিড় করে কথা বলার কারণে কী বোঝাতে চাই সেটা বুঝতে পারছি না। এটা নতুন করে সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর ডাক্তাররা কম কথা বলতে বলেছে, যেটুকু বলা জরুরি সেটা ছাড়া।’
উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা বাতিলে সরকারি ঘোষণা বাস্তবায়ন না হওয়ায় গত ৩০ জুন শনিবার বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।
সংবাদ সম্মেলন শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল হক নূরসহ সাত শিক্ষার্থী আহত হন।
ওই সময় নূরকে আটকে রেখে উপর্যুপরি লাথি-ঘুষিসহ বেধড়ক মারধর করা হয়। বাঁচার জন্য নূর কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পরিচালক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ড. জাভেদ আহমেদকে জড়িয়ে ধরেন। এরপরও হামলাকারীরা থামেনি। তারা নূরের পাশাপাশি শিক্ষক জাভেদকেও মারধর করতে থাকে। এতে তার হাতের একটি আঙুল কেটে যায়।
পরে আহত নূরকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ধানমণ্ডি আনোয়ার খাঁন মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু দুই দিনের মাথায় তাকে ওই হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগ উঠে।
সেদিন মধ্যরাতে নূর জানান, বেসরকারি এ হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ তাকে চিকিৎসা না দিয়ে বের করে দেয়। রাত আড়াইটার পর হুইল চেয়ারে বসা নূরকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আসেন তার পরিবারের সদস্যরা। তখন হাসপাতালের কর্মীরা নূরকে নিয়ে টানাহেচড়া করতে থাকেন।
সেখানে সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে হাসপাতালের কর্মীরা ভেতরে চলে যান। তারা সাংবাদিকদের সঙ্গেও কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
সাংবাদিকদের নুরুল হক নূর বলেন, ’হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে এখন বের হয়ে যেতে। ওরা বলছে, পুলিশ আপনাকে গ্রেফতার করবে। আমরা আপনাকে রাখতে পারব না। আপনারা এখান থেকে চলে যান। ওই সময় নূরকে উদ্দেশ্য করে হাসপাতালের একজনকে বলতে শোনা যায়, মিথ্যা বলবেন না।
তখন কোটা সংস্কার আন্দোলনের এ নেতা বলেন, ’দেখেন, আমি তো খুন করি নাই বা আমি তো কোনো অপরাধ করি নাই। আমি ঢাকা মেডিকেল গেছি, ওখানে তারা আমার চিকিৎসা করতে ইগনোর করছে। আবার এখানে আসলাম, এখানে শুরুর দিন থেকে ডাক্তার বলতেছে, আপনারা এখান থেকে চলে যান। রাতে চলে যান তাড়াতাড়ি। আজ রাত সাড়ে ১২টার দিকে গোছগাছ করে চলে এসেছি। দেখেন, আমরা তো ইচ্ছা করে চলে আসি নাই। এখন আবার আপনাদের (সাংবাদিক) দেখে তারা আমাদের আটকাইছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নূর বলেন, ’ওরা প্রথমে বলেছিল তিন চার দিন থাকতে। এরপর রাতে জানলাম, আমাদের কেউ হাসপাতালে আসলে তাদের ঢুকতে দিচ্ছে না। তারা বলছে, প্রশাসনের নিষেধ আছে। বিকালে ধানমণ্ডি জোনের এডিসি সহকারী কমিশনার আসছেন, আমার পাসওয়ার্ড ইমেল নিয়ে গেছেন। উনি আমাকে ফেসবুকে লাইভে দেখেছেন। উনি বলেছে, তেল বেড়ে গেছে, এরপর যদি আমি ফেসুবকে লাইভে যাই, তাহলে আমাকে গ্রেফতার করা হবে। এটা বলেছে, ডিবি ধানমন্ডি জোনের অতিরিক্ত কমিশনার। ’

News Page Below Ad