গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কাউকেই মন্ত্রিসভায় নেবে না আওয়ামী লীগ। সেইসঙ্গে টেকনোক্র্যাট (অনির্বাচিত) কোটায় সংসদের বাইরের কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যকেও মন্ত্রিপরিষদে না রাখার সিদ্ধান্তে এখনও অটল রয়েছে সরকারি দল।
ফলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার একাদশ জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণার পর মন্ত্রিসভায় শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই থাকবেন। এ জন্য ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করেছেন।
গতকাল তেজগাঁওয়ে তার কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকের পর অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশের খবর জানাজানি হলে এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের গুজব-গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই মনে করেন, বিএনপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সমন্বয়ে গড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো কোনো নেতাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়ার জন্যই টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী সমকালকে জানিয়েছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর মন্ত্রিসভা ছোট করা হয়েছিল। ওই মন্ত্রিসভার তিন টেকনোক্র্যাট সদস্য আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ূয়া এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান পদত্যাগ করেছিলেন। একইভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য গতকালের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পর অনির্বাচিত কোনো ব্যক্তির সরকারে থাকার সুযোগ নেই। ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ে এমনটা বলা হয়েছে। এ কারণে চার টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। তবে তাদের পদত্যাগপত্র কবে থেকে গ্রহণ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন। প্রধানমন্ত্রী গত সোমবার তার সরকারি বাসভবন গণভবনে জাতীয় পার্টির সঙ্গে সংলাপে প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কয়েকজন শীর্ষ নেতা।
গতকালের মন্ত্রিসভা ও সোমবারের সংলাপে উপস্থিত কয়েকজন নেতা প্রধানমন্ত্রীর উদ্ৃব্দতি দিয়ে জানিয়েছেন, বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে অনির্বাচিত মন্ত্রী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মন্ত্রিসভায় থাকতে পারবেন না। তিনি বলেছেন, মন্ত্রিসভার আকার ছোট করার বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাই মন্ত্রিসভার আকার প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে। গতবারও সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা আরও বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার সময় উচ্চ আদালতের রায়ে বলা হয়েছে- সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সরকারের মন্ত্রিসভায় অনির্বাচিত কেউ থাকতে পারবেন না। যেহেতু আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সে কারণে অনির্বাচিত কোনো ব্যক্তি মন্ত্রিসভায় থাকতে পারবেন না। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সংলাপ বুধবার শেষ হচ্ছে। এরপর তিনি বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় গণভবনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংলাপের সবকিছু আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করবেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা আজ বুধবার সকাল ১১টায় গণভবনে দ্বিতীয় দফায় সংলাপে বসছেন। এই সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচনের সময়ে ঐক্যফ্রন্ট কিংবা সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের টেকনোক্র্যাট কোটায় জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, অর্থ এবং আইনমন্ত্রী করার শর্ত দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু এই শর্ত মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতারা মনে করছেন।
আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ সমকালকে বলেন, সংসদের বাইরে থাকা দলগুলোর মধ্য থেকে টেকনোক্র্যাট কোটায় কাউকে মন্ত্রী করার কোনো শর্ত মানবে না আওয়ামী লীগ। সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, সংবিধানের বাইরে কিছুই হবে না। আইন সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায় অনুযায়ী, অনির্বাচিত কোনো ব্যক্তির নির্বাচনের সময় সরকারে থাকার সুযোগ নেই। অর্থাৎ ঐক্যফ্রন্টের কেউ মন্ত্রিসভায় থাকবেন না।
গতকাল পদত্যাগ করার আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান সমকালকে বলেন, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছেড়ে দেন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীরা। আর এটাই নিয়ম। গত সংসদ নির্বাচনের আগেও এমনটা হয়েছে। তাই এটা নতুন কিছু নয়। এটা রুটিন ওয়ার্ক। অর্থাৎ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এমপিদের নিয়েই মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়ে থাকে। ওই সময়ের পর টেকনোক্র্যাটদের কেউ মন্ত্রিসভায় থাকেন না। গতকালের মন্ত্রিসভায় ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান উপস্থিত ছিলেন না।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রস্তুত :বৈঠক শেষে দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রস্তুত রয়েছে। নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় কতটা পরিবর্তন আসবে সে বিষয়ে তিনি ধারণা দিতে পারেননি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মন্ত্রিসভার আকার যাই হোক না কেন, নিয়মিতভাবেই বৈঠক হবে। এটা অব্যাহত থাকবে।
সূত্র:ডেইলি মিরর২৪