দলের প্রয়াত মহাসচিব খন্দকার দোলোয়ার হোসেনের ছেলে খন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলুসহ ৫ প্রার্থীকে শোকজ করেছে বিএনপি। তারা সদ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের প্রতীকে নির্বাচন করেন।
দলটির দাবি, এসব আসনে যাদের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে তারা আইনগতভাবে হাইকোর্ট থেকে প্রার্থী বৈধতার রায় নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।
দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী স্বাক্ষরিত শোকজের চিঠিতে, কেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ২ জানুয়ারি শোকজের চিঠি পাঠানো হয়েছে।
মানিকগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য খন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলু ছাড়াও যাদের শোকজ করা হয়েছে তারা হলেন, নাটোর-১ আসনের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের স্ত্রী কামরুন্নাহার শিরীন, ময়মনসিংহ-১ আসনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক বিচারপতি টিএইচ খানের ছেলে অ্যাডভোকেট আফজাল এইচ খান।
তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। রাজশাহী-৫ আসনে জেলা বিএনপির সহসভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ও নওগাঁ-১ আসনের প্রার্থী জেলা বিএনপির সহসভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান।
শোকজের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, পাঁচজনকে দল শোকজ করেছে। ইতিমধ্যে আবদুল হামিদ ডাবলুসহ আরও একজন শোকজের জবাবও দিয়েছেন। খন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলু বলেন, ’আমার দল একটি সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। আমি শোকজের উত্তর দিয়েছি।’
তবে আফজাল এইচ খান চিঠি পাননি জানিয়ে বলেন, ’আমাকে কেন শোকজ করা হবে? ময়মনসিংহ-১ আসনে প্রার্থী ছিল না বলেই তো আমাকে কেন্দ্র থেকে দলের নমিনেশন চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরে আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি।’ নজরুল ইসলাম বলেন, ’শোকজের কথা শুনেছি। তবে চিঠি এখনও হাতে পাইনি।’
কামরুন্নাহার বলেন, ’আসন শূন্য হওয়ার ঝুঁকি থেকে নাটোর-১ আসনকে মুক্ত করার জন্য দলের স্বার্থে আমি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। আমাকে ১০ জানুয়ারির (আজ) মধ্যে শোকজের উত্তর দিতে বলা হয়েছে। কালকেই (আজ) উত্তর দেব।’
মোস্তাফিজুর রহমানকে একাধিকবার ফোন দেয়া হলে ফোন রিসিভ করেননি। এসব প্রার্থীর দাবি, তাদেরকেও ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি। মনোনয়নপত্র জমাও দেন তারা। তবে চূড়ান্ত মনোনয়নের যে চিঠি নির্বাচন কমিশনে দেয়া হয় তাতে তাদের নাম ছিল না।
৯ ডিসেম্বর দলের আসনভিত্তিক চূড়ান্ত মনোনয়নের একটি চিঠি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে দেয় বিএনপি। দলটির চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে মানিকগঞ্জ-১ আসনে এসএম জিন্নাহ কবির, নাটোর-১ আসনে ঐক্যফ্রন্টের শরিক কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মনজুরুল ইসলাম, ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপির আলী আজগর, রাজশাহী-৫ আসনে নাদিম মোস্তফা ও নওগাঁ-১ আসনে মো. ছালেক চৌধুরীকে ধানের শীষের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
সূত্র জানায়, দলের হাইকমান্ডের পরামর্শেই পাঁচ প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে জবাব পেলে তা দলের নীতিনির্ধারকদের জানানো হবে। পরে তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিএনপির একজন নীতিনির্ধারক বলেন, যাদের শোকজ করা হয়েছে দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন তাদের দেয়া হয়নি। চূড়ান্তভাবে এসব আসনে যাদের ধানের শীষের মনোনয়ন দেয়া হয় তাদের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে হাইকোর্ট থেকে প্রার্থী বৈধতার রায় নিয়ে তারা নির্বাচন করেছেন। এতে করে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।
তারা দলের রীতিনীতিবহির্ভূত কাজ করেছেন। এই নীতিনির্ধারক আরও বলেন, আমরা মনে করি আদালতে না গিয়ে তারা এ বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলাপ করলেই সমাধান হতো।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, মানিকগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি মনোনীত এসএ জিন্নাহ কবিরকে এবং নাটোর-১ আসনের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রার্থী মঞ্জুরুল ইসলামকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।
পরে দলের সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে মানিকগঞ্জ-১ আসনের খন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলু এবং নাটোর-১ আসনের কামরুন্নাহার শিরিন হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। রিটের শুনানির পর আদালত প্রতীক পরিবর্তনের আদেশ দেন।
দলীয় মনোনয়ন পাওয়া ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী আলী আজগরের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগে মনোনয়নপত্র স্থগিতের আদেশ দেন হাইকোর্ট। আলী আজগর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন। আপিল বিভাগ স্থগিতাদেশ বহাল রাখায় আলী আজগরের প্রার্থিতা বাতিল হয়। পরে বিএনপি মনোনীত আরেক প্রার্থী আফজাল এইচ খান ধানের শীষের প্রতীক চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। আফজাল এইচ খানের আবেদন গ্রহণ করে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
২ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিনে কয়েকটি কারণে রাজশাহী-৫ আসনের প্রার্থী নাদিম মোস্তফার মনোনয়ন বাতিল করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। আপিলে নির্বাচন কমিশন থেকে প্রার্থিতা ফিরেও পান নাদিম মোস্তফা। পরে তাকেই এ আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয় বিএনপি। কিন্তু এটি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের পরিপন্থী বলে হাইকোর্টে রিট করেন বিএনপির অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।
পরে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দিতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ওই আসনে নাদিম মোস্তফাকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেয়ার রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়। নওগাঁ-১ আসনেও একই ঘটনা ঘটে। বিএনপির বৈধ প্রার্থী দাবি করে মো. মোস্তাফিজুর রহমান উচ্চ আদালতে রিট করেন।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতে বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ শুনানি শেষে ধানের শীষের বৈধ প্রার্থী হিসেবে মোস্তাফিজুর রহমানকে ধানের শীষ প্রতীক দেয়ার নির্দেশ দেন।
পরে বিএনপির প্রার্থী ডা. ছালেক চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করে তার স্থলে বিএনপির মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে ধানের শীষের বৈধ প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।jugantor