মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাই দুবাই, ওমান এয়ারসহ বেশ কিছু এয়ারলাইন্স বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায় গুটিয়ে নেয়ার চিন্তাভাবনা করছে। এসব এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ হ্যান্ডলিং, লজিস্টিক সাপোর্ট, পার্কিংসহ নানা চার্জ নেয়ার কারণেই তারা ব্যবসায় গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এ দিকে হজ, ওমরাহ ও পর্যটন মওসুমকে ঘিরে প্রতিবছর ট্রাভেল এজেন্সির মধ্যে গড়ে উঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেট দেশী-বিদেশী এয়ারলাইন্সের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিমানের টিকিট ব্লক করে রাখার অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ওই টিকিটই আবার ট্রাভেল এজেন্সি নানা কৌশলে চড়া দামে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ঘটনা চলছে ট্রাভেল সেক্টরে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কালোবাজারি সিন্ডিকেট থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সম্প্রতি ঢাকার নয়াপল্টনের একটি রেস্টুরেন্টে ফিমেল ওয়ার্কার্স রিক্রুটিং এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ব্যানারে আয়োজিত ’এয়ার টিকিটের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রতিবাদ সভায় নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তব্যে ট্রাভেল এজেন্সি ও এয়ারলাইন্সগুলোর নানা অনিয়ম তুলে ধরেন। একই সাথে তারা দ্রুত সঙ্কট থেকে উত্তরণে সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।
ওই অনুষ্ঠানে আগত বক্তারা বলেন, আমাদের দেশের শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্যে কাজের উদ্দেশ্যে গমন করে থাকেন। বিমানের টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের অভিবাসন খরচ প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া বিমানের আসন সঙ্কটের কারণে অনেকেই নির্ধারিত সময়ে যেতে না পারায় বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিগত সময়ে নানা কারণে মাঝেমধ্যে বিমানের টিকিটের দাম বাড়লেও এত অল্প সময়ে টিকিটের দাম কখনো দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়নি।
তারা বলেন, গত কয়েক দিন এই খাতের বিভিন্ন মহলের সাথে আলোচনা করে তারা অবগত হয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী বেশ কিছু এয়ারলাইন্স যেমন ইতিহাদ, ফ্লাই দুবাই, জেড এয়ারওয়েজ, ওমান এয়ারলাইন্সসহ আরো কয়েকটি এয়ারলাইন্স বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসায় গুটিয়ে নিচ্ছে। হ্যান্ডেলিং, লজিস্টিক সাপোর্ট, হাই অপারেশন, হাই ফুয়েল কস্ট, হাই ল্যান্ডিং অ্যান্ড পার্কিং চার্জের কারণে ব্যবসায় গুটানোর কথা বলছে। তারা আরো জেনেছেন, ইতঃপূর্বে ২০০৮ সালে এই ধরনের সঙ্কটের সময় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশের আকাশকে এক বছরের জন্য ওপেন স্কাই ঘোষণা করে সঙ্কট দ্রুততম সময়ের মধ্যে মোকাবেলা করেছিলেন। তখন দেখা গেছে, বেশ কিছু নতুন এয়ারলাইন্স এসে অল্প দিনের মধ্যে টিকিট সহজলভ্য করে সঙ্কট উত্তরণে সহযোগিতা করেছে। ফলে বর্তমান সময়ের সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্যে আগামী ৫ বছরের জন্য পুনরায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ’ওপেন স্কাই’ ঘোষণার দাবি তাদের।
এ দিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে, বিমানের টিকিট কালোবাজারি করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ট্রাভেল ও কিছু এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তাদের মধ্যে গড়ে উঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যার কারণে বিমানের টিকিটের সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। আর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।
গতকাল এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত একজন নাম না প্রকাশ করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, যারা বিমানের টিকিট কালোবাজারি করেছে এবং এখন নানা কৌশলে করার চেষ্টা করছে তাদের এই সেক্টরের লোকজন ভালোভাবেই চেনেন। কারণ তাদের কাছেই তারা সবসময় জিম্মি থাকে। মোট কথা কালোবাজারি করে যারা টিকিটের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের রিজার্ভেশন ব্যবস্থা অটোমেশন ও নজরদারি করার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। যাতে কোনো রকম দুর্নীতির সুযোগ না থাকে। অতীতে দেখা গেছে, টিকিট সিন্ডিকেটের সদস্যরা হজ মওসুমে টিকিট ব্লক করে নির্ধারিত টিকিটের অতিরিক্ত ১০-১৫ হাজার টাকা করে বেশি নিয়েছে। এরপরও ওই চক্রটি অদ্যাবধি রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদের দ্রুত চিহ্নিত করা জরুরি।
ফিমেল ওয়ার্কার রিক্রুটিং এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি টিপু সুলতানের সাথে গতকাল শনিবার বিকেলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে পরে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন। তবে অপর একজন নেতা নয়া দিগন্তকে বলেন, বিমানের টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়ায় অভিবাসন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় আমাদের ব্যবস্থা হুমকির মধ্যে পড়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ওপেন স্কাই পলিসি চালুর বিকল্প নেই। একই সাথে ফরেন এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে আলোচনা করে তাদের বিভিন্ন চার্জ কমানো ও সাপোর্ট দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিমানের অলাভজনক রুটগুলো বন্ধ করতে হবে।
গতকাল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস এম মোসাদ্দিক আহমেদের সাথে এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেলিফোন ধরেননি। তবে বিমানের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিমানের সিট খালি যাচ্ছে না। প্রতিদিনের কার্যক্রম কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। সিট ব্লক করার কোনো সুযোগ নেই।