বর্তমানে আওয়ামীলিগে চলছে শুদ্ধি পরীক্ষা আর ঠিক এরই মাঝে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে একটি আলোচনা। আর সেই আলোচনাটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আওয়ামীলিগের অন্যতম বড় রাজনীতিবিদ জয়নাল হাজারী। সম্প্রতি গনমাধ্যমে একটি খবর বেশ চাওড় হয়েছে আর তা হলো জয়নাল হাজারীকে আওয়ামীলিগের উপদেষ্টা করা হয়েছে। দেশের প্রায় সকল গণমাধ্যেমই এই খবর প্রকাশ করেছে। তবে এটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনার সূত্রপাত হয়েছে আওয়ামীলিগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মন্তব্য নিয়ে। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সমসাময়িক ইস্যুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, জয়নাল হাজারীকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মনোনীত করার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এর পর থেকেই এই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

এবার আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তির ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফেনীর আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী।

জয়নাল হাজারী বলেন, ইতিমধ্যেই আমাকে জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য করেছেন, সেটি গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু এটি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা হচ্ছে। সে কারণে কিছুটা হলেও বিভ্রান্তি দূর করার জন্য আমার এ লাইভে আসা।

তিনি বলেন, যেদিন আমি নেত্রীর কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা গ্রহণ করেছিলাম, সেদিনই নেত্রীকে বলেছিলাম আপনি যে বলছেন আমাকে কখনও বহিষ্কার করেননি। দলও করেনি, আপনিও করেননি। তাহলে দলে আমার অবস্থান কোথায়। তখনই নেত্রী ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন অবস্থান ঠিক হয়ে যাবে। আরও দু’একটা কথা যা বলেছিলাম সেটাও তিনি মেনে নিয়েছিলেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করেছেন।

জয়নাল হাজারী বলেন, এখন বিভ্রান্তির কারণ হচ্ছে আজকেই (বৃহস্পতিবার) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাহেব সচিবালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে তিনি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন- আমাকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা করার কোনো বিষয় তিনি জানেন না।

তিনি বলেন, আমি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই এই জন্য যে, রাজনীতি করতে হলে নাকি কিছু মিথ্যা কথা বলতে হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি (ওবায়দুল কাদের) কোনো মিথ্যা কথা বলেননি। তিনি বলেছেন আমি কিছু জানি না। তিনি বলেছেন- আমার সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। ঠিক, একেবারে ১০০% সত্য। খবর যুগান্তর।

জয়নাল হাজারী বলেন, নেত্রী (শেখ হাসিনা) কারও সঙ্গে আলোচনা করেননি। কারণ কাউকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা অথবা উপদেষ্টা করা এটা নেত্রীর একান্তভাবে নিজস্ব এখতিয়ার। এটা গতবার সম্মেলনেই নেত্রীকে এ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এটা অনেকটা নিয়োগ। এটা কোনো ভোটের মাধ্যমে কাউন্সিলের মাধ্যমে হওয়ার বিষয় নয়। আমার আগেও যাদেরকে উপদেষ্টা কমিটিতে এনেছেন তাদের কাউকেই কারও সঙ্গে আলোচনা করে আনেননি। শুধু একটি চিঠি দিয়ে আওয়ামী লীগ অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এবং সেটি মিডিয়াতে চলে যায়।

তিনি বলেন, আমি এখন সিঙ্গাপুরে আছি চিকিৎসার জন্য। যে কথা বলছিলাম, আমাদের ওবায়দুল কাদের সাহেব যেটা বলেছেন তিনি মিথ্যা বলেননি। ঠিকই তো আছে। কারণ এটা ওবায়দুল কাদের সাহেবের সঙ্গে আলাপ করে করার কোনো দরকার নেই। উনি যানারও কোনো দরকার নেই। আমাকে যে নেত্রী ৪০ লাখ টাকা দিয়েছেন ওটাও তো তিনি (ওবায়দুল কাদের) জানতেন না। আমি উনার বাসায় গিয়ে জানিয়েছি।

জয়নাল হাজারী বলেন, উনি (ওবায়দুল কাদের) হয়তো জানেন না। আমি নিজেও জানি না। যেহেতু আমি সিঙ্গাপুর তখন। রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে যখন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন আমাকে ফোন করে জানালেন যে, নেত্রীর দরখাস্ত হয়ে গেছে। তারপরই দেখি কয়েকটি টেলিভিশনে এ নিউজটি চলে এসেছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমি সিঙ্গাপুরে অসুস্থ অবস্থায় থেকে এসব মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি? সে ক্ষমতা কি আমার আছে?

তিনি বলেন, এখন আজকে (বৃহস্পতিবার) সারাদিন মিডিয়াতে খবর এসেছে যে আমাকে উপদেষ্টার করার বিষয়ে ওবায়দুল কাদের কিছু জানেন না। আমি এ বিষয়টি পরিষ্কার করতে চাই, আমাকে উপদেষ্টা করার বিষয়টা ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আলোচনার বিষয় নয়। তাকে এটা জানতে হবে সেটাও বিষয় নয়। কারণ যেহেতু নেত্রীর এখতিয়ার আছে। এমনকি প্রেসিডিয়ামের সঙ্গে, ওয়ার্কিং কমিটির সঙ্গে কারও সঙ্গেই এ বিষয়ে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই, দরকার নেই। এটা নেত্রীর একক সিদ্ধান্ত। আর আমার বিষয়টা তো সব সময় দেখা গেছে নেত্রী এককভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

জয়নাল হাজারী বলেন, আশ্চর্যের বিষয়- যারা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বলেছে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সেই তারাই, সেই পক্ষই আজকে আবার বলছে আমাকে উপদেষ্টা করা হয়নি। এখানে লোকগুলো দেখবেন, সেই অপশক্তিটাকে দেখবেন এরা কারা, এরা ওরা যারা ২০টি বছর ধরে আমাকে দল থেকে ষড়যন্ত্র করে বাইরে রেখেছিল। কিন্তু আমাকে বহিষ্কার করা হয়নি। নেত্রী ২৫ জন লোক এবং ৩-৪ জন মন্ত্রীর সামনে আমাকে বলেছেন, আমাকে বহিষ্কার করা হয়নি। অথচ আজকেও কেউ কেউ বলছে যে, আমার বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি। যেখানে নেত্রী বলেছেন, আমাকে কখনোই বহিষ্কার করা হয়নি দল থেকে। সেখানে আজও কিছু কুচক্রী বলছে, আমার বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি।

প্রসঙ্গত জয়নাল হাজারী ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ফেনী-২ (সদর) আসন থেকে ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে টানা তিনবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০১ সালের ১৭ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান জয়নাল হাজারী। সংসদ সদস্য হিসেবে তার শেষ মেয়াদে নানা বিতর্কে জড়ান জয়নাল হাজারী। এ কারণে ২০০৪ সালে দল থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর দীর্ঘদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন তিনি। ফেনী থেকে হাজারিকা নামে প্রকাশিত একটি দৈনিকের সম্পাদকও তিনি।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ফিরেন তিনি। পাঁচটি মামলায় ৬০ বছরের সাজা হয় তার।

এরপর ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে আত্মসমর্পণ করলে আট সপ্তাহের জামিন পান হাজারী। পরে ১৫ এপ্রিল নিম্নআদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে পাঠানো হয় কারাগারে। চার মাস কারাভোগের পর ২০০৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হন তিনি।

শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় সম্প্রতি জয়নাল হাজারীকে চিকিৎসার জন্য ৪০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ওই অনুদানের চেক গ্রহণ করতে হাজারী বুধবার গণভবনে গেলে তার সঙ্গে রাজনীতি নিয়েও অনেক কথা হয় দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তার স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নেন এবং তার সুস্থতা কামনা করেন।

প্রসঙ্গত, জয়নাল হাজারী বাংলাদেশের সাবেক সংসদ সদস্য এবং আলোচিত-সমালোচিত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ফেনীর গডফাদার নামেও তিনি বেশ পরিচিত। জয়নাল হাজারী দির্ঘ প্রায় বিশ বছর ধরে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৬-১৯৯৬ পর্যন্ত তিনি তিন বার ফেনী-২ আসনের সাংসদ নির্বাচিত হন।