দুদক, পুরো নাম দুর্নীতি দমন কমিশন। বাংলাদেশের সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতির অবসান ঘটনা ও এবং সকল দুর্নীতির অনুসন্ধান করাই সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের সব থেকে বড় কাজ। তবে বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান টি নিয়ে চলছে নানা আলোচনা সমালোযনা। এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ নিয়েও রয়েছে বেশ নেতিবাচক ধরনা মানুষের মনে।এবার পাওয়া গেলো আরেকটি সংবাদ দুদকের বিরুদ্ধে। প্রায় সাড়ে ৫শ কোটি টাকার মত একটি প্রকল্প জুড়ে হয়েছে এই দুর্নিতী যা এড়ানোর চেষ্টা করে ছিলো দুদক। শুরুতে ৫শ’ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ’বড় ধরণের’ ব্যবস্থায় যাচ্ছে দুদক- এমন একটি আবহও তৈরি করা হয় এখানে ওখানে চিঠিপত্র দিয়ে। সংবাদ মাধ্যমকে জানানো হয়, বিষয়টি অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু কয়েক মাস যেতেই যেন সব অভিযোগ ’পানি’ হয়ে গেল
ঘটনাটি ডাক বিভাগ এবং দুদক মধ্যকার। ’ই.সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি’ ৫শ’ ৪০ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য সম্বলিত একটি অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। ’তফসিলভুক্ত’ অপরাধ হিসেবে অভিযোগটির ওপর কমিশন অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগে উল্লেখিত তথ্যমতে, ডাক অধিদফতর সিন্ডিকেট করে নোট কাউন্টিং এবং ফ্রাংকিং মেশিন কেনে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) থেকে মেশিনগুলো কেনা হলেও এ প্রতিষ্ঠান এসব উৎপাদন করে না। ওই প্রতিষ্ঠানের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন সমঝোতা করে অন্য একটি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টেশিসকে দিয়ে মেশিনগুলো কেনা হয়। বাজার মূল্য ১ লাখ টাকার মেশিন কেনা হয় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকায় টেশিসকে দিয়ে কেনায়। টেশিস থেকে ডাক বিভাগ ২ লাখ ৬০ হাজার টাকায় কেনে। অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে আপাত: নিখুঁত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এই কেনাকাটা সম্পন্ন হয়।

একই প্রকল্পের আওতায় পোস্টাল ক্যাশধারী গ্রাহকদের সেবা দিতে কেনা হয় ২০ হাজার ’পয়েন্ট অব সেল’ বা (পিওএস-পওস) মেশিন। একেকটি মেশিন ৩৫ হাজার টাকায় কেনা হলেও মেশিনগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে না। এমন ডাকঘরও আছে যেখানে ব্যবহার তো দূরে থাক গত তিন বছরে পওস মেশিনের প্যাকেটও খোলা হয়নি। এই কেনাকাটায় প্রকল্পের অন্তত: ৭০ কোটি টাকার অপচয় হয়। একইভাবে প্রকল্পের আওতায় কেনা হয় সোলার প্যানেল, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন, ইউপিএস এবং গাড়ি। এ ক্ষেত্রে অন্তত: ১শ’ ৫০ কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৯৯ কোটি টাকায় রাজধানীর আগারওগাঁওয়ে ডাক অধিদফতরের প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, মতিঝিলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৮০টি ফ্ল্যাট নির্মাণ থেকেও কৌশলে ৩০ কোটি টাকা কমিশন হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ছিলো ওই অভিযোগে। এছাড়া গাড়ি ক্রয়, কর্মকর্তাদের বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি, প্রাইজপোস্টিং, পানিশমেন্ট পোস্টিং এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কয়েকজন ব্যক্তিকেই ঘুরে ফিরে বিদেশ পাঠানোর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও ছিলো ডাক বিভাগের প্রকল্প পরিচালক এবং তৎকালিন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (পরিকল্পনা) বিরুদ্ধে। অবৈধভাবে অর্জিত কোটি কোটি টাকা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার, স্থানান্তর, রূপান্তর, হস্তান্তর, নামে-বেনামে বিপুল অর্থ-বিত্ত গড়ে তোলার অভিযোগও ছিলো। যার পুরোটাই দুদকের তফসিভুক্ত (অর্থ সরকারি অর্থ অপচয় বা আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচার) অপরাধ। কমিশন অভিযোগ আমলে নিয়ে সহকারি পরিচালক সৈয়দ আতাউল কবিরের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। উপ-সহকারী পরিচালক মো. ইসমাইল কমিটির অপর সদস্য। গতবছর ডিসেম্বরে কমিটি অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় সহকারী পরিচালক সৈয়দ আতাউল কবির এককভাবে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন দফতরের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত চান। এর মধ্যে ডাক অধিদফতরের প্রধান কার্যালয় থেকে তিনি রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেন। প্রকল্পটির ডেপুটি প্রকল্প পরিচালক মোস্তাক আহমেদ (বর্তমানে ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল, ডাক অধিপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ে সংযুক্ত) প্রকল্পের টেন্ডার ডকুমেন্টের ফটোকপি সৈয়দ আতাউল কবিরের হাতে পৌঁছে দেন। পওস, ফিঙ্গার প্রিন্ট, কাউন্টিং মেশিন, সোলার প্যানেলসহ প্রকল্পের আওতায় কেনা সামগ্রিগুলো যেসব পোস্ট অফিসে পাঠানো হয়েছে সেগুলোর একটিও তিনি সরেজমিন পরিদর্শন করেননি। ডাক বিভাগের জেলা অফিসও (ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেল) পরিদর্শন করেননি। এমনকি ডাক অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়েও তিনি আসেননি। তিনি তথ্য-উপাত্তের জন্য চিঠি দেন দেশের সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও)র কাছে। ২০১৮ সালের ৫ ডিসেম্বর সহকারী পরিচালক সৈয়দ আতাউল কবির স্বাক্ষরে দেয়া ওই চিঠিতে লেখা হয়, ’অভিযোগে উল্লিখিত ডাক বিভাগের পোস্ট ই-সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি প্রকল্প’র আওতায় আপনার উপজেলাধীন যে সকল ডাকঘরকে ই-সেন্টার হিসেবে রূপান্তরিত করা হয়েছে সে সকল ডাকঘর সমূহে এবং উপজেলা ডাকঘরে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের পোস্ট ই-সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি প্রজেক্ট হতে কি কি দ্রব্যাদি প্রেরণ করা হয়েছে এবং উক্ত ডাকঘরসমূহ ই-সেন্টার হিসাবে চালু আছে কি না তা জানা একান্ত আবশ্যক। এমতাবস্থায় আপনার উপজেলাধীন ডাকঘর সমুহে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ হতে প্রেরিত দ্রব্যাদির তালিকা প্রস্তুত করে এবং উক্ত ডাকঘরসমূহ পোস্ট ই-সেন্টার হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে কি না সে তথ্য জরুরি ভিত্তিতে নিম্নস্বাক্ষরকারীর নিকট প্রেরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনাকে সবিনয়ে অনুরোধ করা হলো।’

ডাক অধিদফতর থেকে অবসরে যাওয়া একজন মহাপরিচালক নাম প্রকাশে আপত্তি জানিয়ে বলেন, ইউএনও’র সঙ্গে ডাক বিভাগের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি পোস্ট সংক্রান্ত তথ্য দেয়ার জন্য সঠিক ব্যক্তি নন। ডাক বিভাগ নিজস্ব আইন ও বিধিতে চলে। কোনো ইউএন পোস্ট অফিস সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেন না। পোস্ট অফিসে ব্যবহৃত সামগ্রি সচল কি অচল এ বিষয়টি কারিগরি। এ সম্পর্কে ইউএনও কি জানবেন? বরং সংশ্লিষ্ট ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেলই তথ্য প্রদানের উপযুক্ত ব্যক্তি।

সৈয়দ আতাউল কবির অত্যন্ত কৌশলে কোনো ডিপিএমজিকে চিঠি না দিয়ে ইউএনওকে চিঠি দেন। এর ফলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা দু’চারটি পোস্ট অফিস পরিদর্শন করে সেগুলোতে প্রকল্পের আওতায় কেনা সামগ্রিগুলো ওই পোস্ট মাস্টার বুঝে পেয়েছেন কি না- এ বিষয়ে তথ্য দেন। তাতে তারা উল্লেখ করেন সামগ্রিগুলো ঠিকঠাক মতো পোস্ট অফিসে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রকল্পের অর্থে কেনা যন্ত্রপাতিগুলো এখন সচল কি না, এগুলো কেনার আদৌ প্রয়োজন ছিলো কি না- সেই কারিগরি প্রশ্ন এবং যৌক্তিকতা এড়াতেই আতাউল কবির এ কৌশল অবলম্বন করেন।

দুদকের অবসরে যাওয়া এক মহাপরিচালক বলেন, এ ধরণের অনুসন্ধানের প্রথম নম্বর কাজ হলো সরেজমিন পরিদর্শন করা। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সন্ধান করা। সেটি করা হয়নি বলেই সম্প্রতি জাহালম-কান্ড ঘটেছে। দ্বিতীয়ত: যেহেতু যন্ত্রপাতি কেনাকাটা সংক্রান্ত অভিযোগ, তাই প্রয়োজন ছিলো তৃতীয় একটি সংস্থা দ্বারা কারিগরি কমিটি গঠন করে হাল- প্রতিবেদন নেয়া। সেটি করা না হলে অনুসন্ধানের জন্য একটি বড় ত্রæটি কিংবা পরিকল্পিত ’ভুল’। ’অন্যকিছু’ না ঘটলে কমিশন এ ধরণের প্রতিবেদন ’নথিভুক্তি’র অনুমোদন দেয়ার কথা নয়।

এদিকে দুদকের একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন মহলের তদবিরে ডাক বিভাগের ৫৪০ কোটি টাকার প্রকল্পের কেনাকাটায় দুর্নীতি ভিন্নখাতে নেয়া হয়। এ জন্য সহকারী পরিচালক সৈয়দ আতাউল কবিরের সঙ্গে প্রকল্প পরিচালকের ২০ লাখ টাকায় রফা হয়। উপ-প্রকল্প পরিচারক মোস্তাক আহমেদ বিষয়টি মধ্যস্থতা করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাক আহমেদ ’অফিস সময়ের বাইরে আমি কথা বলি না। পরে ফোন করুন’ বলে লাইন কেটে দেন। এদিকে নথিভুক্তির চিঠি নিয়ে অতিরিক্ত পোস্ট মাস্টার জেনারেল (পরিকল্পনা) পরবর্তীতে মহাপরিচালক পদে আসীন হোন।

অনুসন্ধান বিষয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক সৈয়দ আতাউল কবিরের কাছে জানতে চাইলে আমতা আমতা করে প্রতিবেদককে বলেন, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। এভাবে কথা বলতে পারব না। আপনি বসদের কাছ থেকে জানুন।

প্রসঙ্গত, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ, ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে গঠন করা হয় এই কমিশনটি। ২০০৪ সালে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন আইন অনুসরন করে দুদক কার্যকর করা হয়।প্রাথমিক পর্যায় একজন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার নিয়ে গঠিত হয় দুর্নীতি দমন কমিশন।এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার সেগুনবাগিচায় অবস্থিত। এ সংস্থার লক্ষ্য হচ্ছে দেশে দুর্নীতি ও দুর্নীতিমূলক কাজ প্রতিরোধ করা। অর্থাৎ যে কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যখন কোন দুর্নীতির অভিযোগ উঠবে তখন এই প্রতিষ্ঠানটি সেই অনুযায়ি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করবে।