শমসের মবিন চৌধুরী বাংলাদেশের আলোচিত একটি নাম। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও জড়িয়ে আছেন তিনি। তবে তার এই খ্যাতি নতুন নয়। বাংলাদেশের ক্রান্তিকাল স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় অনন্য অবদান ও সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে দিয়েছিলেন বীর বিক্রম উপাধি। কাজ করেছেন সেনাবাহিনীতেও। সম্প্রতি প্রকাশ হওয়া একটি বইতে সমশের মুবিনের কর্মরত অবস্থার একটি অধ্যায় প্রকাশ হয়েছে। সেখানে প্রকাশ হয়েছে তার সাহসিকতার আরেকটি দিক। মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমদের সদ্য প্রকাশিত ’বেলা-অবেলা: বাংলাদেশ ১৯৭২-১৯৭৫’ এই বইয়ে বেশ কয়েকটি ঘটনার বর্ননা দেয়া হয়েছে যেখানে সমশের মুবিনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। পাঠকদের উদ্দশ্যে সেটি তুলে ধরা হলো:-

ঘটনার সূত্রপাত একটি বিয়ের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। ইস্কাটন লেডিস ক্লাবে মেজর ডালিমের খালাতো বোন তহমিনার সঙ্গে কর্নেল রেজার বিয়ের অনুষ্ঠানে ডালিমের শ্যালক বাপ্পির সঙ্গে আমন্ত্রিত কয়েকজন কিশোরের বচসা হয়। এরা ছিলেন বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটির (বর্তমান নাম রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের নেতা গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলে। এক পর্যায়ে ডালিম তাদের অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেন। ডালিমের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর একটি গাড়িতে করে গাজী নিজেই উপস্থিত হন। দুটো মাইক্রোবাসে ১০-১২ জন অসামরিক সশস্ত্র লোক তার সঙ্গে এসেছিল। তারা ডালিম, তার স্ত্রী নিম্মি, তার শাশুড়ি এবং আলম ও চুল্লু নামের দুজন অতিথিকে গাড়িতে তুলে রওনা হয়।

এতে লেখা হয়েছে, এরপর মাহবুব ও লিটু দ্রুত ৩২ নম্বর রোডে পৌঁছান। সব শুনে বঙ্গবন্ধু ক্ষুব্ধ হন এবং গাজীকে মাফ চাইতে বলেন। ডালিমরা এতে শান্ত হলেন না। এই ঘটনা জানতে পেরে ডালিমের সেনা বন্ধুরা আরেকটি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন। তারা দুই ট্রাক সেনাসহ গাজীর বাড়িতে হামলা করে ওই বাড়ির সবাইকে ধরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আর্মি কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু সেনা প্রধান মে. জে. সফিউল্লাহকে ডেকে পাঠান এবং তাকে বলেন, ’সৈন্যরা যেন গাজীর পরিবারের লোকদের ছেড়ে দেয়। শফিউল্লাহ কন্ট্রোল রুমের মেজর মোমেনকে বলেন, সবাই বত্রিশ নম্বরে আছেন। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। তুমি গাজীর পরিবারকে ছেড়ে দাও।’ মেজর মোমেন এতেও শান্ত হলেন না। ডালিমের অনুরোধে তিনি ক্যাপ্টেন ফিরোজকে ৩২ নম্বরে পাঠালেন। ডালিম তাকে বললেন, প্রধানমন্ত্রী ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। গাজীর পরিবারকে ছেড়ে দাও।


পরদিন সেনাসদরে এ নিয়ে অনেক গুঞ্জন চলে। ডালিম এবং তার বন্ধুদের এক কথা-তাদের সম্মানে আঘাত করা হয়েছে। এর একটা বিহিত করতে হবে। মেজর নূর চৌধুরী সেনাপ্রধান সফিউল্লাহর কাছে তিন দফা দাবি উপস্থাপন করেন বলে বইতে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, মেজর নূর চৌধুরী বলেন, ’দাবীগুলো আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপনি প্রধানমন্ত্রীকে জানাবেন। যদি না পারেন, তাহলে আপনার এই চেয়ারে ফিরে আসার দরকার নেই। আপনি সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রাখেন না।’

সফিউল্লাহ অসহায়ের মতো বসে থাকলেন। তিনি কিছু বলতে চাইলে তার আগেই লে. সমশের মুবিন চৌধুরী বীরবিক্রম কোমর থেকে বেল্ট খুলে সেনাপ্রধানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, ’আমরা সম্মান আর মর্যাদার জন্য সেনাবাহিনীতে কাজ করি। ওটাই যদি না থাকে, তাহলে এই সেনাবাহিনীতে আর থাকতে চাই না।’

এ সময় উপ সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এসে উপস্থিত। তিনি বললেন, চুপ করো এবং শোনো। সমস্যাটি আমি বুঝেছি এবং তোমাদের দাবী ন্যায্য। সফিউল্লাহ, তুমি নিশ্চয়ই দাবিগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবে এবং তাকে সমস্যার গুরুত্বটি বোঝাবে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সফিইল্লাহ গণভবনের উদ্দেশে রওনা হলেন। ওই সময়ে সেনাসদরে অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল ছিলেন কর্নেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ (পরে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি)। পিএসওদের এক সভায় জেনারেল সফিউল্লাহ এ ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ’স্যার আমার মনে হয় এই দাবিগুলো ন্যায্য। আপনার উচিত হবে প্রধানমন্ত্রীকে এটা বুঝিয়ে বলা এবং দাবি মেনে নিয়ে ওদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে পরামর্শ দেয়া।’ এরশাদের এই মন্তব্যে ডালিমরা অবাক হয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত, সমশের মুবিনের রয়েছে একটি বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। মুক্তিযুদ্ধতে অনবদ্য সাহসিকতার পর যোগ দেন রাজনীতিতে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তিনি দায়িত্ব পালন করেন পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে। এ ছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্তহন। আর এ দায়িত্ব তিনি পালন করেন টানা ২ বছর। এর পর একটা সময় এসে সরে দাড়ান বিএনপির রাজনীতি থেকে। যোগ দেন বিকল্পধারা বাংলাদেশে। এর মাঝে বেশ খানিকটা সময় তিনি ছিলেন রাজনীতি থেকে দুরে।