মানুষের জীবন কতই না বিচিত্র আজ সব আছে তো কাল কিছুই নেই। আবার আজ কিছু নেই তো কাল সব হয়ে যেতেই পারে। কথায় বলে ভাগ্য খুলতে সময় লাগে। কিন্তু নিজের কঠোর পরিশ্রম আর ইচ্ছা শক্তি দিয়ে যদি ভাগ্যের পরিবর্তন করা যায় তবে তা রয়ে যাবে সারা জীবন। কঠোর পরিশ্রমী আর অধ্যাবসায়ী এক জন ফুটবলারের নাম আনসুমানা ক্রোমা তার বাড়ি সেই সুদুর বাড়ি আটলান্টিক মহাসাগরের পাড়ে লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়ায়।ছোটবেলা থেকেই অভাব আর অনটনকে সাথে নিয়ে বড় হয়েছে ক্রোমা। জীবনের নিষ্ঠুরতা দেখছেন খুব কাছ থেকেই। তবে আজ তিনি সফল কিন্তু ভোলেননি সেই দিন গুলোর কথা। নিজের মুখেই শোনাচ্ছিলেন নিজের জীবনের নিষ্ঠুরতম সেই দিন গুলোর কথা।
ছোটবেলা থেকেই ’অভাব’ কথাটা শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন। সাত ছেলে, এক মেয়ের সংসারটা চালাতে যে রীতিমত হিমসিম খেতে হতো ক্রোমার বাবাকে। গাড়ি চালিয়ে কোনোমতে টানতেন অভাবের সংসারটা।

এই সংসারে খিদের সঙ্গে লড়াই করেই বেড়ে উঠেছে ক্রোমার জীবন। তার এই অভাবী জীবনকে বদলে দিল ফুটবল। ভারতে খেলতে এসে এখন তিনি বড় তারকা। হয়েছেন ভারতের জামাই-ও। বিয়ে করেছেন বাঙালি মেয়ে পূজাকে।


চলতি কলকাতা লিগে এখন সর্বোচ্চ গোলদাতা ক্রোমা, গোলের সংখ্যা হল ৯। লিগের শীর্ষে তার দল পিয়ারলেস। আজ (মঙ্গলবার) ইস্টবেঙ্গলের বিপক্ষে গোল করে দলকে জিতিয়েছেন। যেটা করবেন, আগেভাগেই নাকি কথা দিয়ে এসেছিলেন স্ত্রীকে।

জয়ের পর ক্রোমা হুঙ্কার দিয়েই বলেন, ’আমার সুন্দরী বাঙালি স্ত্রীকে গোলটা উৎসর্গ করলাম। ভারতীয় মেয়েকে বিয়ে করার পরে এখন আমি মনে-প্রাণে ভারতীয় হয়ে গিয়েছি। আমি হলাম ময়দানের মেসি। আমার দলকে হারানো গেলেও আমাকে হারানো যাবে না। আমাকে থামানো কঠিন।’


নিজেকে ’মেসি’ ঘোষণা করা ক্রোমার এখনও মনে পড়ে, কত কাঠখড় পুরিয়ে আজকের জায়গায় এসেছেন। ১১ বছর বয়সে প্রথম পেশাদার ফুটবলে হাতেখড়ি লাইবেরিয়ার লিসর এফসিতে। সে কথা বলতে গিয়ে ক্রোমার চোখ গড়িয়ে পড়লো জল।

টাকা যে তার জীবনে কতটা আরাধ্য ছিল সেই স্মৃতি আওরাতে গিয়ে বলেন, ’সই করার পরে প্রথম মাসে ভারতীয় মুদ্রায় পেয়েছিলাম ২০ হাজার টাকা। মা-বাবার হাতে তুলে দিয়ে দারুণ আনন্দ হয়েছিল। আর প্রথম দিন স্থানীয় খবরের কাগজে আমার ছবি বেরোনোর পরে মায়ের আনন্দাশ্রু দেখাও বড় প্রাপ্তি।’ পিয়ারলেস ফুটবল দলের অধিনায়ক পরক্ষণেই বিমর্ষ। বললেন, ’মা আজ অসুস্থ। বাবা মারা গিয়েছেন ১০ বছর আগে।’

অভাবের কারণে লেখাপড়াটা বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারেননি। তবে ফুটবলটাই তার জীবন বদলে দিয়েছে। কিন্তু যে খেলা দিয়েছে আলোর দেখা, সেটি তার বাবা কিছুতেই পছন্দ করতেন না।

ক্রোমার কথায়, ’অভাবের মধ্যে ফুটবলই ছিল আমার জীবনে আলোর মতো। সপ্তম শ্রেণির পরে স্কুলে যাওয়াই বন্ধ হতে বসেছিল। বাবা চাইতেন উকিল হই। ফুটবল খেলতে দিতেন না। লুকিয়ে স্কুলে খেলতাম। সপ্তম শ্রেণিতে বাবা বেতন দিতে না পারায় স্কুলে যেতাম না। প্রধান শিক্ষক আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় আমাকে খেলানোর জন্য বাড়ি এসে এ কথা জানতে পেরে বেতন মওকুফ করে দেন। বাবা স্যারের হাত ধরে কেঁদেছিলেন।’

সেই শিক্ষকের কথা আজও মনে আছে ক্রোমার। জীবন যুদ্ধে তিনি আজ জয়ী, কিন্তু সেই দিনগুলো কি চাইলেই এত সহজে ভোলা যায়!


উল্লেখ্য, পেশা তাঁর ফুটবল। আর নেশা বাঙালির রসগোল্লা, সন্দেশ! নাম আগোগো। বাড়ি অতলান্তিক মহাসাগরের পারে লাইবেরিয়ার রাজধানী মনরোভিয়ায়! যদিও আগোগো নামে কেউ তাঁকে চেনেন না ভারতে। কলকাতা ময়দান তাঁকে চেনে ঘানেফো আনসুমানা নামেই। যা তাঁর প্রয়াত বাবার নাম। ময়দানে তিনি পরিচিত ক্রোমা নামে।