এ যেন একটি রত্নগর্ভা পরিবার। পরিবারের তিনটি ছেলেই যেন এক একটি রত্ন। শুধু খেলায় নয় তারা সমান সফল পড়া-লেখায়ও। তারা যেন সব দিক থেকেই পারদর্শি। বলছিলাম বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ওপেনার শাহরিয়ার নাফিসের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। তাঁর ছোট দুই ভাই নাইম ও নাজিফও খেলাধুলা, পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন সমানতালে। শাহরিয়ার নাফিস বলেছেন তাঁদের তিন ভাইয়ের গল্প। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ওপেনার শাহরিয়ার নাফিসের সাক্ষাৎকার হুবহু তুলে ধরা হলো পাঠকদের উদ্দেশ্যে:-
আপনারা তিন ভাই। তিন ভাই-ই একদিকে যেমন ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে পড়ালেখাতেও বেশ ভালো। কে কোথায় পড়েছেন, সেটা যদি একটু বলেন...
শাহরিয়ার নাফিস: তিন ভাইয়ের মধ্যে আমি বড়। সেন্ট যোসেফ স্কুল আর নটর ডেম কলেজ থেকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে পড়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেজ ভাই ইফতেখার নাইম আহমেদ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছে। স্কলাসটিকা থেকে ও লেভেল, মাস্টারমাইন্ড থেকে এ লেভেল শেষ করে সে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে বিবিএ পড়েছে। এরপর স্নাতকোত্তর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে, ফাইন্যান্সে। আর আমার ছোট ভাই ইখতেদার নাজিফ আহমেদ, অনূর্ধ্ব–১৫ বিশ্বকাপে ক্যাপ্টেন ছিল। স্কলাসটিকা থেকে এ লেভেল শেষ করেছে, ডেইলি স্টার অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে। সানবিমস স্কুল থেকে এ লেভেল শেষ করার পর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর পড়েছিল। এরপর চলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। সেখানেই স্নাতক শেষ করেছে।


বাহ্, তার মানে একাডেমিকভাবে আপনারা প্রত্যেকেই বেশ এগিয়ে আছেন।
নাফিস: এটা আসলে কিছুটা পরিবার থেকে এসেছে। কারণ, আমার দাদা ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করেছেন। পিরোজপুরে তিনি খুব নামকরা একজন শিক্ষক ছিলেন। বাবা এখন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনিও একসময় জগন্নাথ কলেজ থেকে বিএসসি করেছিলেন। মা স্নাতক-স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অতএব, পরিবারের মধ্যেই পড়ালেখার একটা চল আছে।

তিন ভাই-ই যেহেতু পড়ালেখায় ভালো, কখনো ক্রিকেট ছাড়া অন্য কোনো ক্যারিয়ারের স্বপ্ন দেখেছেন?
নাফিস: এখানেও বলতে হবে পরিবারের অবদান। খালাতো ভাইয়েরা সবাই মোটামুটি ক্রিকেট খেলেছেন। ফারুক আহমেদ ভাই জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। পরিবারে খেলাধুলার চল ছিল, মামারা খেলতেন। এটা বলছি ১৯৯০–এর দশকের শুরুর দিকে কথা। খেলাধুলার সঙ্গে থাকলে কোনো খারাপ কিছুতে আমরা যুক্ত হব না, এটা মা-বাবা জানতেন। তাই বাসা থেকে কখনোই নিরুৎসাহিত করা হয়নি। তবে সব সময় বলা হতো, পড়াশোনার পরে খেলাধুলা। বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি জেতার পর বাংলাদেশে ক্রিকেট খেলাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সন্তানেরা চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হোক, এ রকম স্বপ্ন মা-বাবা কখনো দেখেননি?
নাফিস: আব্বার একটু আশা ছিল, হয়তো আমি তাঁর মতো সেনাবাহিনীতে যোগ দেব। সেই ভাবনাতেই ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছি, সঙ্গে সেন্ট যোসেফ স্কুলেও ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। দুটোতেই যখন টিকে গেলাম, তখন বাসায় একটু তর্কবিতর্ক হয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি ক্রিকেটই খেলতে চেয়েছি। তখন তো জাতীয় দল, টেস্ট ক্রিকেট, ওয়ানডে ক্রিকেট—এত কিছু বুঝি না। ইচ্ছা ছিল ঘরোয়া ক্রিকেট খেলব, পাশাপাশি পড়াশোনা করব। যেহেতু আমি খেলতেই চেয়েছি, তাই বাসা থেকে বাধা দেওয়া হয়নি। সেই ধারাবাহিকতায় আমার ভাইয়েরাও ক্রিকেট খেলেছে। আমার মেজ ভাই কিন্তু আমারও আগে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু ওই যে বললাম, সব সময় বলা হয়েছে—পড়ালেখা আগে, তারপর খেলা।


আপনার ভাইয়েরা কি এখনো খেলাধুলার সঙ্গে আছেন?
নাফিস: নাইম যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতক শেষ করে চাকরি করছে, পাশাপাশি খেলছেও। যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেটারদের একটা ক্যাম্প হয়, যেখানে বিভিন্ন স্টেট থেকে খেলোয়াড়দের নেওয়া হয়। গত বছর সেখানেও নাইম ডাক পেয়েছিল। আর নাজিফ দেশে থাকতে অনূর্ধ্ব–১৭ জাতীয় দলেও খেলেছিল। এরপর সে পড়ালেখার দিকেই একটু বেশি মনোযোগ দিয়েছে।

পড়ালেখার কোচিং, না ক্রিকেট কোচিং—আপনাদের বাড়িতে কোনটা বেশি গুরুত্ব পেত?
নাফিস: বিভিন্ন টুর্নামেন্ট, ক্যাম্পে আমাদের নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মা-বাবা সব সময় আগ্রহী ছিলেন। ক্যাম্পে গেলে কিন্তু প্রচুর সময় দিতে হয়। বাসা থেকে বলা হতো, ’পড়াশোনা ঠিক না থাকলে খেলতে দেব না।’ ওই ভয়টাই আসলে কাজে লাগত। পড়া আর খেলা—দুটো একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া খুব কঠিন, এটা ঠিক। কিন্তু অসম্ভব নয়। আমরা অনেক সময় বলি, সময় নেই, আসলে কিন্তু অনেক সময় থাকে। নিয়মটা সহজ—খেলতাম, বাকি সময় পড়তাম। আর স্কুলেরও একটা বড় অবদান আছে। আমার ভাইয়েরা বা আমি যেসব স্কুলে পড়েছি, সেখানে সারা বছরই পড়ার চাপ থাকে। তাই সারা বছর একটু একটু করে পড়ার কারণে পরীক্ষার সময় আর কঠিন মনে হয়নি।


খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকলে যে মানুষের মধ্যে একটা ’খেলোয়াড়ি মনোভাব’ তৈরি হয়, আপনার কি মনে হয় এটা পড়ালেখা বা অন্য যেকোনো ক্যারিয়ারে সহায়তা করে?
নাফিস: দেখুন, মানুষের যে পাঁচটি মৌলিক চাহিদা আছে, এর মধ্যে একটা কিন্তু শিক্ষা। এই শিক্ষা একাডেমিক হতে পারে, আবার অন্য যেকোনো কিছু থেকেই আমরা শিখি। ছোটবেলা থেকে খেলাধুলা ও পড়ালেখা দুটি পাশাপাশি চালিয়ে গেছি, একটা আরেকটার জন্য সহায়ক হয়েছে। মানুষ যেমন শরীর ঠিক রাখার জন্য শরীরচর্চা করে, সে রকম পড়ালেখা হচ্ছে মস্তিষ্কের একটা অনুশীলন। একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি বই পড়া, পত্রিকা পড়া—এগুলোর মাধ্যমেও মস্তিষ্কের অনুশীলন হয়। একটা সময় আমাদের বাসায় টেলিভিশন দেখতে মানা করা হতো। এখন মনে হয়, এখনকার সময়ের তুলনায় টেলিভিশনটাই ভালো ছিল। এখন জগৎটা ছয় ইঞ্চি একটা স্ক্রিনের মধ্যে আটকা পড়েছে। এখান থেকেও কিন্তু চাইলে অনেক কিছু শেখা যায়, যদি আমরা প্রচুর নিবন্ধ পড়ি বা ভালো লেখা পড়ি। কিন্তু সেই চর্চাটা আমাদের নেই।

আপনি যখন পুরোদমে জাতীয় দলে খেলতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে কি বন্ধুরা অন্য চোখে দেখতেন?
নাফিস: বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই সব সময় আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছে—এই অনুভূতিটা আমি সারা জীবন বুকে ধারণ করে রাখতে চাই। কখনো অবশ্য নিজেকে ও রকম ’তারকা’ মনে হয়নি। আমি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করেছি, আমার শিক্ষকদের সহায়তা ছাড়া এটা কখনোই সম্ভব হতো না।


উল্লেখ্য,শাহরিয়ার নাফিস বাংলাদেশ দলের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে ২০০৫ সালে তার অভিষেক ঘটে। বাংলাদেশ দলের প্রথম ইংল্যান্ড সফরে তিনি দলভুক্ত হন যদিও তার আগে মাত্র ৫টি প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা ছিল। তার আগে তিনি বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের হয়ে খেলেন। তার প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচের সুযোগ ঘটে ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে তিনি ৭৫ রান করে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন।