আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৪৩ আসনে আলাদা প্রার্থী থাকছে জাতীয় পার্টির।
এর মধ্যে ২৯টি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে লড়বেন বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। বাকিগুলোতে আওয়ামী লীগ জোটের প্রার্থী থাকলেও তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে থাকবেন লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী। নির্বাচনে লাঙ্গলের এই প্রার্থীরা হয়ে উঠতে পারে আওয়ামী লীগের পথের কাঁটা।
তবে মোট কতটি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকছে, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য এসেছে এইচ এম এরশাদের দলটির নেতাদের কাছ থেকে।
৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন রোববার বিকালে জাতীয় পার্টি পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে দলের চূড়ান্ত মনোনীতদের তালিকা দেওয়া হয়।
জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এস এম ফয়সাল চিশতী তালিকা জমা দিয়ে সাংবাদিকদের জানান, মোট ১৭২টি আসনে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী থাকছে।
তিনি বলেন, "পার্টি চেয়ারম্যানের অনুমোদনে মহাসচিব স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত তালিকা কমিশনকে দিয়েছি আমরা। ১৭২ আসনের মধ্যে মহাজোটের সঙ্গে ২৯ জন এবং উন্মুক্তভাবে ১৪৩ প্রার্থী থাকবে।"
তবে দলের নতুন মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ বনানীতে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকছে ১৬১টি আসনে। এর মধ্যে ২৯টি আসনে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীরা মহাজোটের।
চিশতির বক্তব্যের কথা জানানো হলে তিনি বলেন, "না, না .. এমন কোনো চিঠি জমা হয়নি। আমি যেটা পাঠিয়েছি, সেটাই জমা হয়েছে। আমরা আজ দুপুরে এই তালিকা চূড়ান্ত করেছি।
"সকালে এই তালিকা নিয়ে আমি সিএমএইচে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছে গিয়েছিলাম। তার সাথে কথা বলে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। তিনিও জানেন, আমরা ১৩২টি আসন উন্মুক্ত পাচ্ছি।"
"জোটের বাইরে আমাদের নির্ধারিত আসন ১৩২....এটাই চূড়ান্ত ,,, এটাই ফাইনাল," বলেন তিনি।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সুনীল শুভ রায় স্বাক্ষরিত চিঠিতে ’বিভ্রান্তি’ তৈরি হয়েছে দাবি করে রাঙ্গাঁ বলেন, "প্রেস সেক্রেটারির সঙ্গে আমার কোনো আলোচনা হয় নাই। আমাকে জিজ্ঞাসা করা উচিৎ ছিল। তাহলে এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হত না।
"কালকে সারারাত ১০০ বার টেলিফোন করে ওনাকে পাই নাই। মন খারাপ হয়েছে ওনার উপর। সকালে অনেক বার ফোন করে ওনাকে পাই নাই।"
রাঙ্গাঁ ও চিশতী উভয়েই আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ২৯টি আসন ছাড় পাওয়ার দাবি করলেও নির্বাচন কমিশনে আওয়ামী লীগ যে প্রার্থী তালিকা দিয়েছে, তাতে জাতীয় পার্টির জন্য ২৬টি আসন রাখতে দেখা গেছে।
নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিশতী বলেন, "প্রথমে তালিকায় উন্মুক্ত প্রার্থী ১৩২ জনের কথা উল্লেখ থাকলে পরে এ সংখ্যা বেড়েছে। ১১ জন বেড়ে উন্মুক্ত থাকবে ১৪৩ জন হয়েছে।"
জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য চিশতি নিজেও ঢাকা-১১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আছেন এ কে এম রহমতউল্লাহ।
চিশতী বলেন, "আমরা দুইভাবে প্রার্থী দিয়েছি। মহাজোট আকারে ২৯টি আর মহাজোটের বাইরে উন্মুক্ত থাকছে ১৪৩ জন।"
প্রতীকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমরা কখনই নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করি না। এবারও আমরা লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করব।"
উন্মুক্ত আসন প্রসঙ্গে রাঙ্গাঁ বলেন, "প্রতিটি আসনে আমাদের অনেক প্রার্থী রয়েছে। আওয়ামী লীগেরও একের অধিক প্রার্থী রয়েছে। এটা নিয়ে একটু অসুবিধা হচ্ছিল। পরে মহাজোট থেকে সিদ্ধান্ত আসল, ঠিক আছে উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক। এ আসনগুলোতে দুদলের প্রার্থীদের নির্বাচন করতে কোনো বাধা নাই।
"আমাদের বিবেচনায় ছিল, আমাদের প্রার্থী দাঁড়ালে আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তেমনিভাবে আমাদের প্রার্থীর বিষয়টিও ছিল। এসব বিবেচনায় দুই দলই যেন দুদলের সহযোগিতা পায়, সেটা বিবেচনা করে আসন ওপেন রাখা হয়েছে।"
এই বিষয়ে আওয়ামী লীগের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
রাঙ্গাঁ মনে করছেন, ১৩২টি আসন উন্মুক্ত করে দেওয়ায় মহাজোটের দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ’লাভবান হবে’।
জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে যেসব আসন পাওয়ার কথা জানিয়েছে, তাতে ঢাকা-১৭ আসনে এরশাদ এবং  ময়মনসিংহ-৭ আসনে রওশন এরশাদের নাম রয়েছে।
তবে ইসিতে দেওয়া আওয়ামী লীগের চিঠিতে ঢাকা-১৭ আসনে চিত্রনায়ক ফারুক এবং ময়মনসিংহ-৭ আসনে হাফেজ রুহুল আমিন মাদানীর নাম রয়েছে নৌকার প্রার্থী হিসেবে।
তবে রংপুর-৩ (সদর) আসন এরশাদের জন্য এবং ময়মনসিংহ-৪ আসন রওশন এরশাদের জন্য ফাঁকা রেখেছে আওয়ামী লীগ।
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর-কোতোয়ালি এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৬ আসনও জাতীয় পার্টিকে ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। বর্তমান সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদই এখানে মহাজোটের প্রার্থী হচ্ছেন।
ঢাকার আরেকটি আসনও জাতীয় পার্টিকে দেওয়া হয়েছে। শ্যামপুর, জুরাইন ও পোস্তগলা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৪ আসনে বর্তমান সাংসদ সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এবারও মহাজোটের মনোনয়ন পেয়েছেন।
জাতীয় পার্টির কো চেয়ারম্যান জি এম কাদের লড়বেন লালমনিরহাট-৩ আসনে মহাজোটের হয়ে। মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ প্রার্থী হচ্ছেন রংপুর-১ আসন থেকে মহাজোট থেকে।
মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টির অন্য প্রার্থীরা হলেন
কুড়িগ্রাম-২ আসনে পনির উদ্দিন আহমেদ, নীলফামারী-৩ আসনে রানা মোহাম্মদ সোহেল, গাইবান্ধা-১ আসনে শামীম হায়দার পাটোয়ারী, বগুড়া-২ আসনে শরীফুল ইসলাম জিন্নাহ, বগুড়া-৩ আসনে নুরুল ইসলাম তালুকদার, বগুড়া-৬ আসনে নুরুল ইসলাম ওমর, বগুড়া-৭ আসনে আলতাফ আলী, বরিশাল-৬ আসনে নাসরিন জাহান রত্না, পিরোজপুর-৩ আসনে রুস্তম আলী ফরাজী, ময়মনসিংহ-৮ আসনে ফখরুল ইমাম, টাঙ্গাইল-৫ আসনে শফিউল্লাহ আল মুনির, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে মুজিবুল হক চুন্নু, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে লিয়াকত হোসেন খোকা, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে সেলিম ওসমান, সুনামগঞ্জ-৪ আসনে পীর ফজলুর রহমান, সিলেট-২ আসনে মো. ইয়াহিয়া চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জিয়াউল হক মৃধা, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে মোহাম্মদ নোমান, চট্টগ্রাম-৫ আসনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ফেনী-৩ আসনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন।
বরিশাল-৩ আসনে গোলাম কিবরিয়া টিপু মহাজোটের প্রার্থী বলে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে সেখানে ১৪ দলীয় জোট শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির টিপু সুলতানকে নৌকা প্রতীক দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
কুড়িগ্রাম-১ আসনে এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান মহাজোটের প্রার্থী বলে জাতীয় পার্টি দাবি করলেও সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছেন আসলাম হোসেন সওদাগর।

আরো পড়ুন

Error: No articles to display